03

ভালোবাসা নাকি প্রতিশোধ? পর্ব 3

" অতসী জাস্ট লাস্ট চান্স তোমায় দিলাম, বস এর কাছে যেয়ে ক্ষমা চাইবে । প্রজেক্ট টা এপ্রুভ এর জন্য তুমি যেয়ে স্যার এর কাছে বলবে । নয়তো তোমায় এই কোম্পানী তে আমি রাখতে পারবো না!'

উমেশ যাদব এর গম গমে চিৎকার এখনো অতসীর কানে বাজছে! আনমনে হেঁটে অফিস থেকে বাড়ি যাচ্ছিল সে।

" আরে দিদি, রাস্তার মাঝখান থেকে এভাবে কেনো যাচ্ছেন! মরার শখ হলে অন্য কোথাও যান!"

অতসীর ধ্যান ভাঙল একটি গাড়ি চালক এর তীব্র কটাক্ষ ভরা কন্ঠে। গাড়িটি সাইড কাটিয়ে চলে গেলেও অতসী মাঝ রাস্তায় অর্থব এর মতো দাঁড়িয়ে রইল। তপ্ত রোদে পুড়ে যাচ্ছে রাস্তা ঘাট। এই গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা অতসীর। হাতের ছাতা টা ঠিক করে রাস্তার ধার এ সরে আসল সে। তার ম্যানেজার তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। ওনার কথা না শুনলে বরাবর এর মতো তাকে এই চাকরি টা খোয়াতে হবে! কেনো তার সাথে এমন টা হচ্ছে!  অভিরাজ সিংহানিয়া তাদের বস। নিজেকে ভাবে টা কি?  বীণা দোষে তাকে ক্ষমা চাইতে হবেই বা কেনো? এত অহংকার ব্যক্তিটার? অতসীর মনে মনে অদ্ভুত ঘৃণা উৎপন্ন হলো। সে কিছুতেই ওই ব্যক্তি টার সামনে মাথা নত করবে না। অন্য কাজ খুঁজবে তাও ঠিক আছে। এত বড় মুম্বই শহরে কাজ খুঁজলেই পেয়ে যাবে সে। পরের দিন গিয়েই রিজাইন লেটার দিয়ে আসবে  অতসী।

এসব ভাবতে ভাবতেই বি ব্লক এর সামনে এসে পৌঁছাল সে। বি ব্লক রাস্তাতেই একটি ফ্ল্যাটে সে তার বোন আর ঠাম্মি ভাড়া থাকে। কিন্তু তার চোখ তার ফ্ল্যাটের সামনে একটি এম্বুলেন্স এ গিয়ে পৌঁছাল। ব্যস্ত পায়ে সেদিকে এগিয়ে এলো অতসী। কারোর কিছু হয়েছে? তাদের প্রতিবেশী? বা অন্য কারোর কিন্তু সামনে আসতেই এম্বুলেন্স এর সামনে স্ট্রেচার এ তার  ঠাম্মির শায়িত রক্তাক্ত শরীর এর ওপর দৃষ্টি পাত করতেই অতসীর সারা শরীর অবশ হয়ে এলো। তার বোন অর্ণী ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল।

" দি দেখ না ঠাম্মির এক্সিডেন্ট হয়েছে। বাজারে গিয়েছিল আমাকে বলে । ৩০ মিনিট ও পার হয় নি হঠাৎ একটি ফোন আসে এই খবর জানাল কিছু লোক। "

অর্ণী হাউমাউ করে কেঁদে যাচ্ছে। কিন্তু অতসীর চোখ বেয়ে একফোঁটা জল পড়ল না । তার শরীর শক্ত হয়ে এলো নিমিষে। বোন কে আগলে কাপা গলায় সে বলল, কি হয়েছে ঠাম্মির? আপনারা নার্সিংহোমে ভর্তি করান নি কেনো!

" রাস্তা পার করছিলেন তখনই একটি গাড়ি ওনার শরীর কে বাজে ভাবে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। ঈশ্বর সহায় বলে এখনো বেঁচে আছেন কিন্তু হাতে সময় কম। খুবই গুরুতর জখম হয়েছেন । তার ওপর বয়স এত বেশি! তো রিস্ক প্রচণ্ড!"

" ম্যাডাম, পেশেন্ট এর বাড়ির লোক কেউ ছিল না। নার্সিংহোমে ভর্তি করাতে আমাউন্ট জমা করতে হয় তবেই চিকিৎসা শুরু হবে!"

অতসীর চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

" চিকিৎসা শুরু করুন। যত  টাকা লাগে আমি জমা করে দেবো!"

তার গলা শক্ত। কঠোর! মনের মাঝে পুরোনো ক্ষত টা আবারও তাজা হলো। তার মা পাপা কে সে বাঁচাতে পারে নি কিন্তু ঠাম্মি! ঠাম্মি তাদের ছোট থেকে বড় করেছে, মানুষ করেছে! ঠাম্মি একমাত্র তাদের ছত্র ছায়া। যত টাকা লাগুক অতসী নিজে জোগাড় করে হলেও তার ঠাম্মি  তথা অনুরাধা দেবী কে বাঁচাবে।

অতসী নিজের জমানো দশ হাজার টাকা জমা দিয়ে শহরের মাঝারি  স্তর এর একটি নার্সিং হোমে অনুরাধা দেবী কে  ভর্তি করালেন।  একা একটি মেয়ে, এত বড় শহরে উন্মাদের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে—কখনো রিসেপশন, কখনো ডাক্তারের কেবিন, কখনো ফার্মেসি।হাসপাতালের সাদা দেয়ালগুলো যেন আরও বেশি ঠান্ডা, নির্দয় মনে হচ্ছিল আজ।

অর্ণী এক কোণে বসে কাঁদছে, আর অতসী দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে।

“ মিসেস অনুরাধার অবস্থা খুব একটা ভালো নয়, ইমিডিয়েট অপারেশন করতে হবে। কিন্তু আগে পঞ্চাশ হাজার টাকা ডিপোজিট করতে হবে,” ডাক্তারের গলা নিরাসক্ত।পঞ্চাশ হাজার!

অতসীর বুকের ভেতরটা ধপ করে উঠল।তার

কাছে এখন আছে মাত্র… শূন্য! হাতের ফোনটা শক্ত করে ধরে সে একের পর এক নম্বরে কল করতে লাগল—তার কিছু বন্ধু, সহকর্মী, পুরোনো পরিচিত…কিন্তু কেউই এত বড় অঙ্কের টাকা এই মুহূর্তে দিতে পারল না।শেষে ফোনটা নিঃশব্দে নেমে এলো তার হাত থেকে।মাথার ভেতর হঠাৎ একটা নাম বাজল—অভিরাজ সিংহানিয়া। তার বস…

যার কাছে ক্ষমা চাইতে সে অস্বীকার করেছিল। নয়তো তার ম্যানেজার তাকে জব থেকে বের করে দেবে।মনের মধ্যে অহংকার আর অসহায়তার ভয়ংকর লড়াই শুরু হলো।একদিকে নিজের সম্মান…অন্যদিকে ঠাম্মির জীবন। অর্ণীর কান্নাভেজা মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই অতসী চোখ বন্ধ করল।

“আমি হারতে পারি… কিন্তু ঠাম্মিকে হারাতে পারবো না,” নিজের মনেই ফিসফিস করে বলল সে। পরের মুহূর্তেই সে ফোনটা তুলে নিল।কাঁপা হাতে ডায়াল করল সেই নম্বরটা।রিং…একবার…

দু’বার…তার বুকের ভেতর যেন হৃদপিণ্ডটা ফেটে বেরিয়ে আসবে। হাত পা কাপছিল তার।তৃতীয় রিং-এ ফোনটা রিসিভ হলো।ওপাশ থেকে ভেসে এলো গম্ভীর, ঠান্ডা কণ্ঠ—

“হ্যালো?”

অতসীর গলা শুকিয়ে গেল।কিছুক্ষণ কোনো শব্দই বেরোল না।

“কে বলছেন?” এবার কণ্ঠটা একটু বিরক্ত।

অতসী চোখ বন্ধ করে বলল—

“স্যার… আমি অতসী…”

এক সেকেন্ডের নীরবতা।

তারপর—

“who's Atasi?”ওপর থেকে কটাক্ষ ভরা একটি কন্ঠ শুনে অতসী দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

" স্যার আমি অতসী সিং ওবেরয়। আমি .. আমি"

কথাগুলো যেন কাঁটার মতো বিঁধল তার বুকের ভেতর।

অতসী ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল—

“আমি… আমি কাল আপনার সাথে দেখা করতে চাই, সার…”

ওপাশে হালকা হাসির শব্দ শোনা গেল।

“ক্ষমা চাইতে?”

অতসীর চোখ দিয়ে অবশেষে জল গড়িয়ে পড়ল।

কিন্তু গলাটা শক্ত রেখেই বলল—

“হ্যাঁ, স্যার…”

“গুড। কাল সকাল দশটায় আমার কেবিনে আসো। ” কলটা কেটে গেল।

অতসী কিছুক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে রইল।

মনে হচ্ছিল যেন নিজের একটা অংশ আজ সে হারিয়ে ফেলল। কিন্তু তারপরই সে আইসিইউর কাঁচের ভেতর তাকাল—শুয়ে আছেন তার ঠাম্মি, নিস্তেজ, প্রাণহীন।

“আমি আছি ঠাম্মি… তোমায় কিছু হতে দেবো না,” ফিসফিস করে বলল সে।তার চোখে এবার জল নয়—জ্বলছিল এক অদম্য জেদ।

_________________________________________

" স্যার আমি বিগত এক ঘন্টা ধরে বসে রয়েছি। অভিরাজ স্যার কে বলুন না আমার খুব তাড়া রয়েছে!"

অতসী একপ্রকার অধৈর্য হয়ে কিয়ান রয় কে উদ্দেশ্য করে বলল । অতসী এখন সিংহানিয়া গ্রুপ কোম্পানির দশ তারা অফিসে বসে রয়েছে। পরণে অতি সাধারণ শর্ট কুর্তি আর জিন্স । পুরো কোম্পানী কম লাক্সারিয়াস মহল লাগছে অতসীর কাছে। মুম্বইয়ের জুহু বিচের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কাঁচের বিল্ডিংটা যেন অন্য এক জগৎ। চকচকে মার্বেল ফ্লোর, চারপাশে ব্যস্ত কর্মীদের আনাগোনা, আর সর্বত্র এক অদৃশ্য ক্ষমতার চাপ—সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন অতসীর শ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছিল। পুরো অফিস টাই অভিরাজ সিংহানিয়ার রাজত্ব।

কিয়ানের ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে সে আবার বলল,

“প্লিজ, আর কতক্ষণ? আমার সত্যিই খুব জরুরি কাজ আছে।”

কিয়ান রয় মাথা না তুলেই ঠান্ডা গলায় বলল,

“ম্যাম, স্যার যখন ফ্রি হবেন তখনই ডাকবেন। আপনি বসুন।”

অতসীর মুঠো শক্ত হয়ে গেল।এটা কি ইচ্ছা করেই করানো হচ্ছে? তাকে অপমান করার জন্য?

ঘড়ির কাঁটা যেন আজ ইচ্ছে করেই ধীরে চলছে।

এক ঘণ্টা… দেড় ঘণ্টা… দুই ঘণ্টা…

শেষমেশ কিয়ানের ফোন বেজে উঠল।

“ইয়েস স্যার… ওকে স্যার।”

ফোন কেটে সে অতসীর দিকে তাকাল,

“স্যার আপনাকে ডাকছেন।”

অতসীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।ধীরে ধীরে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে।কাঁচের দরজায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে এক মুহূর্ত থেমে গেল—ক্লান্ত চোখ, ফ্যাকাশে মুখ…কিন্তু চোখের গভীরে এক অদম্য জেদ।সে দরজায় নক করল।

“Come in.”

ভেতরে ঢুকতেই যেন পুরো পরিবেশটাই বদলে গেল।

বড় কেবিন, দেয়ালে দামি পেইন্টিং, আর মাঝখানে ঘুরন্ত চেয়ারে বসে আছে—

অভিরাজ সিংহানিয়া।

সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, পেছন ফিরে।

ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।তীক্ষ্ণ চোখ… ঠান্ডা দৃষ্টি…আর ঠোঁটের কোণে হালকা বিদ্রুপ।

“Finally… মিস অতসী সিং ওবেরয়।”

অতসীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।

“স্যার…”

“তাহলে?” অভিরাজ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল,

“গতকাল তো অনেক আত্মসম্মান ছিল তোমার। আজ হঠাৎ বদলে গেলে?”

কথাগুলো যেন ছুরির মতো বিঁধছিল।

অতসী চোখ নামিয়ে নিল। মনে হচ্ছিল চড়া দুটো কথা শুনিয়ে দিতে!তার গলা শুকিয়ে এলো।

কিন্তু পরের মুহূর্তেই ঠাম্মির মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে।

সে চোখ বন্ধ করে বলল—

“আমি… আমি আমার আচরণের জন্য দুঃখিত, স্যার।”

অভিরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার চোখে যেন কিছু একটা খুঁজছিল।

“জোরে বলো। আমি ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছি না।”

অতসীর চোখে জল চলে এল।তবুও সে গলাটা শক্ত করে বলল—“আই’ম স্যরি, স্যার…”কেবিনে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।হঠাৎ অভিরাজ হালকা হেসে উঠল।“Interesting…”সে টেবিলের দিকে গিয়ে বসে পড়ল,“একটা apology… আর তুমি ভাবছো সব ঠিক হয়ে যাবে?”অতসী এবার মাথা তুলল।

তার চোখে ভাঙা অহংকারের সাথে মিশে আছে মরিয়া আকুতি।“স্যার… আমার ঠাম্মি হাসপাতালে… অপারেশন করতে হবে… আমার টাকার খুব প্রয়োজন”“Stop.”অভিরাজ হাত তুলে থামিয়ে দিল।“Personal drama আমার কাছে কাজ করে না, মিস ওবেরয়।”অতসীর গলা আটকে গেল।শেষ ভরসাটুকুও কি ভেঙে যাবে?

কিন্তু হঠাৎ—“কত টাকা লাগবে?”

অতসী অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

“পঞ্চাশ হাজার…” তার গলা কাঁপছিল।

অভিরাজ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল,তার চোখে আবার সেই রহস্যময় হাসি।

“আমি দিতে পারি।”

এক মুহূর্তে যেন অতসীর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।

“কিন্তু…”শব্দটা শুনেই তার বুক কেঁপে উঠল।

“এর বদলে তুমি আমাকে কী দেবে?”

কেবিনের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

অতসীর হাত কাঁপছে…চোখে ভয়, অপমান, আর অসহায়তা একসাথে ভিড় করেছে।সে বুঝতে পারছে—এই মানুষটা শুধু তার ক্ষমা নয়…আরও কিছু চাইছে ব্যক্তিটির চোখে এমন কিছু রয়েছে যা তার আত্মসম্মান কে হনন করতে প্রস্তুত!

“কি চান আপনি…?” ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল সে।

অভিরাজ ধীরে ধীরে উঠে তার সামনে এসে দাঁড়াল।তার চোখে অদ্ভুত এক ঝলক।

“একটা ডিল, মিস অতসী।”

সে ঝুঁকে এসে খুব ধীরে  হাস্কি কন্ঠে বলল—

" একটি রাত! ইয়েস.. আমার সাথে একটি রাত কাটাতে হবে তোমায়!"

______________________________________

পজিটিভ নেগেটিভ মন্তব্য কে সম্মান দিয়েই আমি এই গল্প এগিয়ে যাবো। আশা করি যারা আমার সাথে ছিলেন সকলে থাকবেন♥️🧿🧿🧿 পাশে ।

Write a comment ...

Write a comment ...

story universe ( স্নেহার ডায়রি)

Pro
A proud pratilipi bengali writer