95

Tragedy!

মিহিরিমার রক্তাক্ত ও সংজ্ঞাহীন শরীরটা দোতলার সিঁড়ির শেষ ধাপে নিথর হয়ে পড়ে রইল। মার্বেলের মেঝেতে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল লাল রক্ত। রোজি সিঁড়ির ওপর থেকে পৈশাচিক শান্তিতে সেই দৃশ্য দেখছিল। কিন্তু তার উল্লাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

ঠিক তখনই ম্যানশনের পেছনের গেট ভেদ করে বিকট শব্দে ব্ল্যাক এসইউভির টায়ার স্কিড করল। কন্টেইনার ইয়ার্ডে যাওয়ার মাঝপথেই ইনসাইডার ট্রেইটরের আইপি অ্যাড্রেস রোজির ফোনের সাথে ম্যাচ করায় ইউভান মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পেরেছিল বিপদ ম্যানশনের ভেতরেই!

গাড়ির দরজা খোলার আগেই ইউভান সিংহ বিক্রমে ম্যানশনের প্রধান হলে ঝড়ো গতিতে প্রবেশ করল। কিন্তু হলরুমে পা রাখতেই তার পায়ের তলার মাটি সরে গেল।

সিঁড়ির নিচে রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর হয়ে পড়ে আছে তার প্রাণপ্রিয় মিহিরিমা।

"মিহিরিমা...!"

ইউভানের বুকফাটা আর্তনাদে পুরো ডিউক ম্যানশন যেন কেঁপে উঠল। মাফিয়া ওয়ার্ল্ডের নির্দয়, নিষ্ঠুর ইউভান ডিউক এক লহমায় হাঁটু মুড়ে আছড়ে পড়ল মিহিরিমার পাশে। তার হাত কাঁপছিল। পরম আতঙ্কে, ব্যাকুলতায় মিহিরিমার মাথাটি কোলে তুলে নিতেই নিজের হাত রক্তে ভেসে গেল। ইউভানের পসেসিভ ও নীলচে চোখ দুটোতে তখন তীব্র আতঙ্ক ভয়ে সিঁটিয়ে এলো।

"না... না... বেবীগার্ল! চোখ খোলো!তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারো না!" ইউভানের থমথমে গলা ভেঙে খানখান হয়ে গেল।

উপরে দাঁড়িয়ে থাকা রোজি ভয়ে পিছিয়ে যেতেই ডেভিড এসে তার চুলে ধরে মেঝেতে আছড়ে ফেলল। রোজি কাঁপা গলায় চিৎকার করে উঠল, "স্যার! ও আপনার যোগ্য নয়! আমি আপনাকে ভালোবাসি। আয়রা জেকব  এর সন্তান!

কথা শেষ হওয়ার আগেই ইউভানের পকেট থেকে বের হওয়া গান সাইলেন্সারে ঝাঁঝরা হয়ে গেল নিমিষেই রোজীর দেহ। কোনো আফসোস বা দ্বিতীয় সুযোগ ইউভানের অভিধানে নেই।

"ডেভিড! প্রাইভেট হাসপাতাল রেডি করো! এখনই!" ইউভান মিহিরিমাকে নিজের চওড়া বাহুতে কোলপাঁজা করে তুলে নিল।

গাড়িতে যাওয়ার পুরোটা সময় ইউভান মিহিরিমার কপালে আর ঠোঁটে ব্যাকুলভাবে মুখ গুঁজে রেখেছিল। তার চার মাসের বাচ্চার রক্ত আর স্ত্রীর সংজ্ঞাহীন চেহারা তাকে ভেতরের থেকে এক উন্মাদ পশুতে পরিণত করছিল।

জরুরি বিভাগে মিহিরিমাকে নিয়ে যাওয়ার পর আইসিইউ-এর রেড লাইট জ্বলে উঠল। বাইরে করিডোরে ইউভানের পরনের সাদা শার্টে তখন মিহিরিমার রক্ত জমাট বেঁধে আছে। ডাক্তার বাইরে বেরিয়ে আসতেই ইউভান গলার কলার চেপে ধরল—

"যদি আমার স্ত্রী আর বাচ্চার কিছু হয়, এই পুরো লন্ডন শহরের সব ডাক্তারকে আমি একসাথে পুঁতে ফেলব!"

ডাক্তার থরথর করে কেঁপে উঠে বললেন, "মি. ডিউক, পেশেন্ট প্রচুর ব্লিডিংয়ের কারণে অতি আশঙ্কাজনক। আমরা চেষ্টা করছি, কিন্তু বাচ্চার হার্টবিট খুব দুর্বল..."

আইসিইউ-এর বাইরে লাল বাতিটা তখনও জ্বলছিল-নেভছিল। ইউভানের বুকের ভেতর প্রতি মুহূর্তে একটা হাজার ও যন্ত্রণা দলা পাকাচ্ছিল, কিন্তু তার চোখের নীলচে মণিতে জমে উঠল এক নৃশংস, পৈশাচিক হিংস্রতা। মিহিরিমা আর তার অনাগত সন্তানের এই অবস্থার জন্য দায়ী প্রতিটি মুখকে আজ পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলার সময় এসে গেছে।

ইউভান একপলক আইসিইউ-এর বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে ডেভিডের দিকে ঘুরল। তার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক শান্ত, কিন্তু সেই শান্তভাবের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক প্রলয়ঙ্করি ধ্বংসের রূপ।

"সবকটাকে তুলে এনেছ?" ইউভান নিচু, থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করল।

"ইয়েস, বস। অ্যান্ডারসন সিন্ডিকেটের গোপন আস্তানা থেকে লারা, রেহান, ফারহান আর ইসাবেলাকে একসাথে তুলে আনা হয়েছে। ইস্ট-এন্ডের আন্ডারগ্রাউন্ড সাইলোতে বন্দি রাখা আছে ওদের," ডেভিড মাথা নিচু করে জানাল।

ইউভান শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে সাইলোর উদ্দেশ্যে রওনা দিল। রক্তে ভেজা সাদা শার্টটা সে বদলায়নি; শত্রু যেন শেষ নিঃশ্বাস ফেলার আগে দেখে যায়—কার রক্তের মাশুল তারা দিতে চলেছে।

ইস্ট-এন্ডের অন্ধকার আন্ডারগ্রাউন্ড সাইলো

পুরো ঘরটা ভ্যাপসা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ আর অন্ধকারে আচ্ছন্ন। ঘরের মাঝখানে চারটে শক্ত লোহার চেয়ারে শিকল দিয়ে বাঁধা রয়েছে লারা, রেহান, ফারহান আর ইসাবেলা। ওদের হাত-পা লোহার চেইন দিয়ে এমনভাবে পেঁচানো যে এক ইঞ্চি নড়ারও উপায় নেই।

ভারী বুটের শব্দে চারজনই একসাথে শিহরে উঠল। আধো আলো-ছায়ায় দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল ইউভান। তার হাতে একটি মেটাল রড, আর চোখে খুনের উন্মাদনা।

"ইউভি... প্লিজ! আমাকে ছেড়ে দাও! আমি কিছু করিনি, সব পরিকল্পনা রেহান আর লারার ছিল!" ইসাবেলা ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।

ফারহান আর রেহান শিকল ঝাঁকিয়ে মুক্ত হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, আর লারা বিষাক্ত চোখে ইউভানের দিকে তাকিয়ে ফুঁসছিল।

ইউভান কোনো কথার জবাব দিল না। সে ধীরপায়ে ঘরের কোণে রাখা এক বিশাল লোহার হাইড্রোলিক গেটের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক হাড়হিম করা পৈশাচিক হাসি।

"তোরা ভেবেছিলি আমার মিহিরিমা আর বাচ্চার গায়ে হাত দিয়ে আমার সাম্রাজ্যে বেঁচে থাকবি?" ইউভানের থমথমে গলা পুরো সাইলোতে থরথর করে কাঁপন ধরিয়ে দিল। "তোদের জন্য সহজ মৃত্যু বড় বেশি দয়া হয়ে যাবে।"

ইউভান সুইচবোর্ডে হাত দিয়ে হাইড্রোলিক গেটটি খুলতেই ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে ভেসে এলো এক ভয়াল, বিকট গর্জন।

খাঁচা থেকে বেরিয়ে এলো চার-চারটে বিশাল আকারের, ক্ষুধার্ত শিকারি রটউইলার কুকুর! কুকুরগুলোর মুখ থেকে লালা ঝরছিল, চোখ দুটো হিংস্রতায় লাল হয়ে আছে। দিনশেষে ওদের কোনো খাবার দেওয়া হয়নি—ওদের আজ তৈরি করা হয়েছে কেবল ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য।

"নো! নো! ইউভান, প্লিজ! ডোন্ট ডু দিস!" লারা আর রেহানের আর্তচিৎকারে পুরো অন্ধকার ঘরটা যেন ফেটে পড়তে চাইল। ইসাবেলা ভয়ে চিৎকার করতে করতে জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলো।

ইউভান পকেট থেকে পিস্তল বের করে কুকুরগুলোর দিকে তাক করে শূন্যে একটা ফায়ার করল। তীব্র গুলির শব্দে হিংস্র কুকুরগুলো আরও উন্মত্ত হয়ে সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়ল চারজনের গায়ের ওপর!

মাংস ছিঁড়ে নেওয়ার বিকট শব্দ, হাড় মড়মড় করার বিভীষিকা আর চার শত্রুর অবর্ণনীয় করুণ আর্তনাদে আন্ডারগ্রাউন্ড সাইলো এক জীবন্ত নরকে পরিণত হলো। ইউভান একবিন্দু চোখের পাতা না ফেলে, পকেটে হাত গুঁজে নিস্পৃহ চোখে সেই ধ্বংসলীলা উপভোগ করল। তার স্ত্রীর প্রতি ফোঁটা রক্তের হিসাব সে ইঞ্চি ইঞ্চি করে বুঝে নিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে ইউভানের ফোনে ডেভিডের ব্যাকুল কল এলো—

"বস! আইসিইউ থেকে ডক্টর ডেকেছেন! মিহিরিমা ম্যাডামের জ্ঞান ফিরেছে!"

ইউভান এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। সাইলোর রক্ত জল করা আর্তনাদ পেছনে ফেলে সে বিদ্যুৎবেগে বেরিয়ে এলো বাইরের রোদের আলোয়—তার একমাত্র সত্য, তার মিহিরিমার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য।

হাসপাতালের দীর্ঘ করিডোরে ইউভানের ভারী বুটের শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। পরনের শার্টে তখনও  রক্তের দাগ শুকায়নি, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল ছিল না। তার নীলচে চোখে তখন কেবল এক ব্যাকুল আকুলতা—তার মিহিরিমাকে সুস্থ দেখার তীব্র তৃষ্ণা।

আইসিইউ-এর ভারী কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই ঘরের থমথমে নীরবতা ইউভানের বুকে এসে বিধল। ধবধবে সাদা বিছানায় শুয়ে আছে মিহিরিমা। মুখে অক্সিজেন মাস্ক, হাতে স্যালাইনের চ্যানেল, আর ইসিজি মেশিনের নিয়মিত টিক-টিক শব্দ জানান দিচ্ছে সে বেঁচে আছে।

ইউভান ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। পরম আশঙ্কায়, অতি সাবধানতায় সে মিহিরিমার বরফশীতল হাতটা নিজের দুটি উষ্ণ হাতের তালুতে তুলে নিল। তারপর নিজের মাথাটি মিহিরিমার হাতের ওপর রেখে এক দীর্ঘ, ভাঙা শ্বাস ছাড়ল—যে শ্যাডো প্যান্থার কে পুরো লন্ডন শহর ভয় পায়, সে আজ তার স্ত্রীর পাশে এসে সম্পূর্ণ নিঃস্ব, সম্পূর্ণ সমর্পিত।

"বেবীগার্ল..." ইউভানের থমথমে, আকুল কণ্ঠস্বরে মিহিরিমার চোখের পাতা দুটো সামান্য কেঁপে উঠল।

ধীরে ধীরে ঢুলুঢুলু চোখ মেলে তাকাল মিহিরিমা। আবছা আলোয় ইউভানের সেই চেনা নীলচে আজ পরম অনুশোচনায় ভরা মুখটা দেখতেই তার শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুর্বল হাসি ফুটে উঠল।

মিহিরিমা একদম নিচু, ক্ষীণ স্বরে ফিসফিস করে উঠল, "ইউভান... আমাদের... আমাদের বাচ্চা...?"

ঠিক সেই মুহূর্তে আইসিইউ-এর সিনিয়র ডক্টর এগিয়ে এলেন। ইউভানের দিকে তাকিয়ে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, "ইটস আ মিরাকেল, মি. ডিউক! এত বড় এক্সিডেন্ট আর ব্লিডিংয়ের পরেও পেশেন্টের চার মাসের গর্ভের বাচ্চা একদম নিরাপদ আছে। গড হ্যাজ সেভড দেম বোথ।"

ডাক্তারের কথাগুলো শোনামাত্রই ইউভানের চওড়া বুকটা এক গভীর স্বস্তিতে উথলে উঠল। তার  কঠোর সত্তা গলে গিয়ে চোখের কোণে এক ফোঁটা জল জমাট বাঁধল। সে আলতো করে মিহিরিমার গালে হাত রেখে তার কপালে, গন্ডদেশে আর নরম ঠোঁটে অজস্র ব্যাকুল চুম্বন এঁকে দিল।

"আমাদের বাচ্চা একদম ঠিক আছে, wifey... " ইউভান মিহিরিমার কানে কানে ফিসফিস করে বলল। তার হাত পরম সুরক্ষায় চলে গেল মিহিরিমার চার মাসের গর্ভবতী পেটের ওপর।

মিহিরিমা ইউভানের বুকের শার্টের কাপড়ে নিজের দুর্বল আঙুলগুলো আটকে দিল। সে জানে, বাইরে এখন কোনো লারা, রেহান বা রোজির ভয় আর নেই। ইউভান তাদের এই পৃথিবীকে চিরতরে সমস্ত কালছায়া থেকে মুক্ত করে দিয়েছে।

"আর কখনো আমাকে ছেড়ে দূরে যাবে না, ইউভান..." মিহিরিমা আধো ঘুমে ঢলে পড়তে পড়তে বিড়বিড় করল।

ইউভান মিহিরিমার কপালে নিজের চিবুক ঠেকিয়ে এক গম্ভীর ও চিরন্তন প্রতিজ্ঞা করল, "নেভার, বেবীগার্ল। যতদিন এই বুকে নিঃশ্বাস আছে, এই হাত আমি ছাড়ব না।"

চলবে?

This story about to end.  যারা পড়ছেন অবশ্যই জানাবেন কেমন লাগলো। পরবর্তী পর্ব শেষ পর্ব হবে এই গল্পের।

Write a comment ...

Write a comment ...

story universe ( স্নেহার ডায়রি)

Pro
A proud pratilipi bengali writer