ডিউক ম্যানশনের মাস্টার বেডরুমে কাঁচের স্লাইডিং জানালার ওপারে লন্ডনের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন রাত নেমে এসেছে। ইউভানের বুকের মাঝে মাথা পেতে মিহিরিমা দাঁড়িয়ে ছিল ঘনিষ্ট হয়ে, ঠিক তখনই ইউভানের ফোনে ভাইব্রেশন ছড়িয়ে পড়ল। ইউভান একহাতে মিহিরিমার কোমর ধরে রেখেই পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে তাকাল—ডেভিডের কল।
"বলো ডেভিড," ইউভানের গলা মুহূর্তে বরফের মতো শীতল ও গম্ভীর হয়ে উঠল।
"বস, ইন্টারপোলের ভেতরের এক ইনফরমার থেকে খবর পেয়েছি। রেহান আর লারা নিজে থেকে পালায়নি, লন্ডনের অ্যান্ডারসন সিন্ডিকেট ওদের জেল থেকে বের হতে সাহায্য করেছে। ওরা শহরের উপকণ্ঠে ইস্ট-এন্ডের এক পরিত্যক্ত কন্টেইনার ইয়ার্ডে আশ্রয় নিয়েছে তবে এটা নিশ্চিত ডিউক ম্যানশন এ তারা আর ফিরে আসতে পারবে না," ডেভিডের স্বর থমথমে। "তবে আর সবচেয়ে বড় কথা, ম্যানশনের ভেতরের কেউ একজন নিয়মিত ওদের কাছে সিকিউরিটি আপডেট পাঠাচ্ছিল।"
ইউভানের চোখের নীলাভ মণি পৈশাচিক হিংস্রতায় জ্বলে উঠল। তার চওড়া চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সে মিহিরিমার দিকে তাকাল, যে ব্যাকুল চোখে তার মুখের অভিব্যক্তি পড়ার চেষ্টা করছে।
"কন্টেইনার ইয়ার্ডের চারপাশে আমাদের লোক ঘেরাও করে রাখুক। আর ম্যানশনের যে ট্রেইটর রেহানের তথ্য পাঠাচ্ছিল, তাকে ১০ মিনিটের মধ্যে টর্চার সেলে নিয়ে এসো," ইউভানের নির্দেশ দিয়ে ফোন কেটে দিল।
মিহিরিমা ইউভানের হাতের ওপর নিজের হাত চেপে ধরল, "ইউভান, তুমি কোথায় যাচ্ছ? এই রাতে—"
ইউভান মিহিরিমার কপালে আর ঠোঁটে এক নিবিড়, স্পর্শ এঁকে দিল। তার থমথমে গলার ফিসফিস মিহিরিমার কাঁপন ধরিয়ে দিল, "তোমার আর বেবীর নিরাপত্তার মাঝে যে আসবে, তাকে উপড়ে ফেলা আমার দায়িত্ব, wifey। তুমি শান্ত হয়ে ঘুমাও, ঘরের বাইরে সশস্ত্র পাহারা থাকবে।"
ইউভান কালো লেদার জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিচে নেমে সিকিউরিটি কেয়ারটেকারদের শেষ নির্দেশ দিয়ে ডেভিডের সাথে ব্ল্যাক এসইউভি চড়ে রওনা হলো ইস্ট-এন্ডের উদ্দেশ্যে।
রাত গভীর হতেই পুরো ডিউক ম্যানশন এক থমথমে নীরবতায় ডুবে গেল। কিন্তু ঘড়ির কাঁটায় যখন রাত ৩টে, তখন গ্র্যানীর ঘর থেকে এক অদ্ভুত ধরনের শব্দ ভেসে এলো, আর ঠিক তখনই ম্যানশনের ব্যাক-গেটের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো হঠাৎ অকেজো হয়ে গেল! ইউভান বাইরে চলে যাওয়ার পর থেকেই মিহিরিমার মনের ভেতর এক বিষণ্ন দুশ্চিন্তা কাজ করছিল। আয়রা তার পাশেই ঘুমোচ্ছে। প্রেগন্যান্সির ক্লান্তিতে চোখ দুটো বুজে আসলেও কিছুতেই ঘুম আসছিল না তার।
ঠিক তখনই করিডোর পেরিয়ে গ্র্যানীর ঘরের দিক থেকে এক করুণ ও বিকট চিৎকার ভেসে এলো—
" ম্যাম! বাঁচান! গ্র্যানী নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না! ছোট ম্যাম, শিগগির আসুন!"
কণ্ঠটি আর কারও নয়, দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত রোজি’র!
গলার আওয়াজ শুনেই মিহিরিমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পরনের পোশাক সামলে ব্যাকুল পায়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল সে। পেটের ভেতরে চার মাসের ছোট্ট প্রাণটার কথা ভেবে নিজের এক হাত সাবধানে পেটের ওপর চেপে রেখেছিল মিহিরিমা।
দোতলার বিশাল মার্বেলের পেঁচানো সিঁড়ির একদম মাথায় পৌঁছাতেই অন্ধকারে একটা ছায়ামূর্তি এসে মিহিরিমার পথ আগলে দাঁড়াল। আলো-আধাঁরির আলোয় রোজিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিহিরিমা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "রোজি! কী হয়েছে গ্র্যানীর? তুমি হঠাৎ এভাবে চিৎকার করছ কেন—"
কথাটা শেষ করার সুযোগই পেল না মিহিরিমা।
রোজির মুখে কোনো উৎকণ্ঠা বা ভয়ের ছাপ ছিল না; বরং তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত, পৈশাচিক হাসি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রোজি তার দুই হাত দিয়ে মিহিরিমার বুকে আর কাঁধে প্রচণ্ড শক্তিতে ধাক্কা মারল!
"তোমার আর তোমার এই বাচ্চার শেষ এখানেই, মারিয়া! আমি ইউ ভান স্যার কে ভালোবাসতাম ছোট থেকে। তুমি না থাকলে আজ উনি আমার হতেন।" রোজির ঠান্ডা ও হিংস্র গলার আওয়াজ পুরো করিডোরে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল।
অপ্রত্যাশিত এই ধাক্কায় মিহিরিমার পা পিছলে গেল। সিঁড়ির প্রথম ধাপে ভারসাম্য হারিয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ার সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে আবছা আলোয় সে রোজির কুৎসিত হিংসাত্মক মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেল। যে রোজি এতদিন ধরে তাদের সেবা করে এসেছে, যে রোজিকে তারা পরিবারের সদস্যের মতো বিশ্বাস করত—সেই রোজিই আজ এই বিশ্বাসঘাতকতা করল!
ধাক্কার চোটে আর চরম আকস্মিকতায় মিহিরিমার বুক চিরে এক তীব্র আর্তনাদ বের হয়ে এলো—
"ইউভান...!"
একটির পর একটি শক্ত মার্বেলের সিঁড়িতে আছড়ে পড়তে পড়তে মিহিরিমার শরীর অবশ হয়ে এলো। তলপেটে এক তীব্র, অসহ্য যন্ত্রণার বিদ্যুৎ খেলে গেল। চোখের সামনে ধোঁয়াশা নেমে আসার ঠিক আগের মুহূর্তে মিহিরিমা অনুভব করল, সিঁড়ির ধাপে গড়িয়ে পড়তে পড়তে তার উরু বেয়ে নেমে আসছে গরম রক্তের ধারা। চোখের সামনে আলোটা ধীরে ধীরে নিভে আসার সাথে সাথে মিহিরিমার চেতনাহীন শরীরটা সিঁড়ির একদম
নিচে এসে এলিয়ে পড়ল।



Write a comment ...