93

Welcome home.

পরদিন সকালে লন্ডনের আকাশে হালকা মেঘ আর মৃদু রোদের খেলা, শীতের আমেজ নেই। কুইন্সটাউন ছেড়ে তারা প্রাইভেট জেটে রওনা দিয়েছিল রাতে এবং দীর্ঘ যাত্রার পর অবশেষে গাড়ি এসে থামল ডিউক ম্যানশনের সুবিশাল সিংহদ্বারের সামনে।

ল্যান্ড রোভার থেকে ইউভান প্রথমে নেমে হাত বাড়িয়ে দিল মিহিরিমার দিকে। পেছনে ডেভিড আর একঝাঁক সশস্ত্র বডিগার্ড ততক্ষণে চারপাশ ঘিরে ফেলেছে। আয়রা ততক্ষণে গাড়ির পেছনে ইউভানের জ্যাকেট জড়িয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন। ইউভান একহাতে আয়রাকে কোলে নিয়ে অন্যহাতে মিহিরিমার কোমর জড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। মিহিরিমার বুক যেনো থমকে গেল । কিছু মাস আগেও সে এখানে এসেছিল একজন কর্মচারী হিসেবে। কিন্তু আজ ইউভান এর অর্ধাঙ্গিনী হয়ে অবশেষে মর্যাদা ফিরে পেল। তবে ভিলায় যেনো আকাশ পাতাল পার্থক্য এখন । আগের মতো রেহান, লারা , ইসাবেলা, ফারহান এর উপদ্রপ নেই। অবশেষে তাদের থেকে মুক্তি পেয়েছে এই ভিলা।

তারা লিভিং রুমে পা রাখতেই ডেভিড দ্রুত এগিয়ে এলো। তার মুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ।

"বস, ইন্টারপোল ও সিক্রেট সার্ভিসের তরফ থেকে কনফার্ম করা হয়েছে—লারা আর রেহান জেল থেকে পালিয়ে গেছে। ওরা লন্ডনেই কোথাও গা ঢাকা দিয়ে আছে," ডেভিড নিচু স্বরে রিপোর্ট দিল।

ইউভানের চওড়া চোয়াল মুহূর্তে শক্ত হয়ে উঠল, চোখের নীল মনি যেন হিংস্র হয়ে উঠল।

"ওরা জেলে ছিল, ডেভিড! এত হাই-সিকিউরিটির পর পালিয়ে গেল কীভাবে?" ইউভানের থমথমে গলার আওয়াজ পুরো হলে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করল।

ইউভানের এই প্রচণ্ড উদ্বেগ আর ক্ষোভ মিহিরিমার চোখ এড়ালো না। সে ভালো করেই জানে, ইউভান নিজের জীবন পরোয়া করে না, কিন্তু তার আর গর্ভের বাচ্চার সামান্যতম ক্ষতিও ইউভান সহ্য করবে না। মিহিরিমা ইউভানের বাহুতে হাত রেখে শান্ত গলায় বলল—

"ইউভান, শান্ত হও। ম্যানশনে আমরা সুরক্ষিত আছি। তুমি অহেতুক নিজেকে অস্থির কোরো না।"

ইউভান মিহিরিমার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ধীরস্বরে বলল, "ওদের স্বাধীনভাবে বাইরে ঘুরে বেড়ানো মানেই তোমার আর বাচ্চার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়া। আমি কোনো ঝুঁকি নেব না, বেবী গার্ল।"

মিহিরিমা পরিস্থিতি কিছুটা হালকা করতে বলল, "তুমি ডেভিডের সাথে সিকিউরিটি মিটিংটা শেষ করো। আমি ততক্ষণে গিয়ে গ্র্যানীর সাথে দেখা করে আসি? উনি নিশ্চয়ই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।"

ইউভান মাথা নেড়ে সায় দিল এবং তৎক্ষণাৎ মিহিরিমার সাথে দুজন বডিগার্ড পাঠাল। ইউভান গ্র্যানী কে জানিয়েছে মিহিরিমা জীবিত, মারিয়াই মিহিরিমা, বৃদ্ধা যেনো বিশ্বাস ই করতে পারছিলেন না। লন্ডন এ আসার পথে ভিডিও কলে কথা হয় তাদের। মিসেস আলেকজেন্দ্রি ক্যান্সার এ আক্রান্ত হলেও স্মৃতি শক্তি ওতো দুর্বল হয় নি । তিনি বিশ্বাস করতেন ওনার নাত বৌ জীবিত কিন্তু ইসাবেলা ওনাকে প্রতিনিয়ত লারা আর ইউভির বিয়ের জন্য চাপ দিত এমনকি, মারার হুমকি ও দিয়েছিল । জীবনের শেষ বয়সে এক মাত্র নাতি কে হারাতে তিনি চান নি! ওদের কথা ওতো উনি চলতেন। অবশেষে ইউভান এর স্মৃতি ফিরেছে ওনার নাত বৌ ফিরে এসেছে আর কি চাই?

মিহিরিমা গ্র্যানীর ঘরে ঢুকতেই বৃদ্ধা পরম মমতায় তাকে জড়িয়ে ধরলেন। প্রেগন্যান্সির কারণে মিহিরিমার মুখে আসা আলাদা এক উজ্জ্বলতা আর চার মাসের গর্ভবতী পেট দেখে গ্র্যানীর চোখ খুশিতে জলে ভরে উঠল।

"কেমন আছিস, আমার লক্ষ্মী মেয়ে?" গ্র্যানী মিহিরিমার মাথায় হাত বুলিয়ে আলতো করে জিজ্ঞেস করলেন।

"আমি খুব ভালো আছি, গ্র্যানী। ইউভান আমার আর বাচ্চা দের  সব সময় খেয়াল রাখছে," মিহিরিমা মৃদু হেসে উত্তর দিল।

কিন্তু গ্র্যানীর মুখের হালকা অমলিন হাসির পেছনে কোথাও যেন একটা গভীর চিন্তার ছায়া ছিল। ইউভানের অস্থিরতা আর রেহান-লারার পালিয়ে যাওয়ার খবর গ্র্যানীও জানেন।

গ্র্যানী মিহিরিমার হাত দুটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিচু স্বরে বললেন, "রেহান আর লারা শুধু সাধারণ কোনো শত্রু নয়, মিহি। সাবধানে থেকো। আয়রা কে দেখে আমার আত্মা শান্তি পেল। পুনরায় সুখবর বাড়িতে এসেছে। শেষ সময়ে যে এত টা খুশি হবো ভাবনা তেই ছিল না।

মিহিরিমা গ্র্যানীর হাত দুটি নিজের গালে ঠেকিয়ে মৃদু হাসল। " তুমি কোনো চিন্তা কর না, গ্র্যানী। এখন ইউভান আমাদের সাথে আছে, আর আমাদের পরিবার সম্পূর্ণ।"

গ্র্যানীর চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা জল মিহিরিমা পরম আদরে মুছে দিল। দীর্ঘদিন ধরে ইসাবেলা আর লারার দেওয়া মানসিক অত্যাচার, ভয় আর ব্ল্যাকমেইলিং সামলে বৃদ্ধা আজ সত্যি শান্তিতে শ্বাস নিতে পারছেন। কিন্তু শরীরের ভেতরের মারণব্যাধি ক্যান্সারের ছাপ ওনার ক্লান্ত চেহারায় স্পষ্ট।

"ইসাবেলা আর লারা তোকে কম কষ্ট দেয়নি, রে মা..." গ্র্যানী হাঁপাতে হাঁপাতে নিচু স্বরে বললেন। "তোকে এই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর ওরা মনে করেছিল ইউভানকে পুরোপুরি ওদের মুঠোয় পুরে নেবে। কিন্তু রক্ত কখনো সত্যি গোপন রাখতে পারে না। ইউভানের স্মৃতি ফিরতেই সব হিসাব বদলে গেল।"

মিহিরিমা গ্র্যানীর বুকে মাথা রেখে শান্ত গলায় বলল, "ওসব অতীত এখন, গ্র্যানী। এখন শুধু আয়রা, আমাদের এই হতে যাওয়া সন্তান আর তোমাকে সুস্থ রাখাটাই আসল।"

ঠিক সেই সময়ে ঘরের ভারী দরজায় আলতো টোকা পড়ল। ইউভান ভেতরে প্রবেশ করল। তার গায়ের কালো ব্লেজারটা খোলা, শার্টের ওপরের দুটো বোতাম আলগা করা। তবে চোখের থমথমে ভাবটা কিছুটা কমেছে, মিহিরিমাকে গ্র্যানীর পাশে নিরাপদ দেখে তার চেহারায় এক চিলতে শান্তির রেখা ফুটে উঠল।

ইউভান সামনে এগিয়ে এসে বৃদ্ধার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। "গ্র্যানী, ডাক্তার নিচে এসেছেন। ওনার সাথে তোমার আজকের চেকআপটা সেরে ফেলা দরকার।"

গ্র্যানী মৃদু হেসে নাতির চিবুক ছুঁয়ে দিলেন, "আমি ঠিক আছি ইউভি। তুই তোর স্ত্রীকে নিয়ে নিজের ঘরে যা। অতটা রাস্তা সফর করে এসেছে, ওর বিশ্রামের প্রয়োজন।"

ইউভান আর কোনো কথা না বাড়িয়ে মিহিরিমার হাত নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরে নিল। গ্র্যানীর ঘর থেকে বের হয়ে দীর্ঘ করিডোর পেরিয়ে তারা যখন তাদের পুরনো ও পরিচিত বিশাল মাস্টার বেডরুমে পা রাখল, মিহিরিমার মনের ভেতর একসাথে বহু স্মৃতি ভিড় করে এলো।

এই সেই ঘর, যেখানে একসময় সে মারিয়া হয়ে ভয়ে কাঁপত, আবার এখানেই ইউভানের একচ্ছত্র অধিকার আর ভালোবাসায় নিজেকে সঁপে দিয়েছিল। ইউভান পেছন থেকে এসে মিহিরিমার কোমরে দু’হাত জড়িয়ে ধরল, চিবুকটা আলতো করে রাখল তার কাঁধে।

"কী ভাবছ, wifey?" ইউভানের গভীর ও প্রলুব্ধকর কণ্ঠ মিহিরিমার কানের কাছে ফিসফিস করে উঠল।

মিহিরিমা ইউভানের হাতের ওপর হাত রেখে পেছনে ফিরে তাকাল, "ভাবছি, কত ঝড়ের পর আজ আমরা আবার একসাথে এই ঘরে ফিরে এলাম।"

ইউভান মিহিরিমার চার মাসের গর্ভবতী পেটে হাত রেখে খুব সাবধানে তাকে নিজের বুকে টেনে নিল। "লন্ডনের এই আকাশ বা শহরের যেকোনো কোণে লুকিয়ে থাকা শত্রুই হোক না কেন—তোমাকে আর আমাদের সন্তানদের ছুঁতে গেলে আগে আমার সম্মুখীন হয়ে যেতে হবে। দিস ইজ মাই প্রমিস।"

মিহিরিমা ইউভানের বুকে মুখ লুকিয়ে এক পরম তৃপ্তির শ্বাস নিল। তবে তারা দুজনেই জানত, রেহান আর লারা বাইরে স্বাধীনভাবে থাকা মানে ঝড় যেকোনো মুহূর্তে আঘাত হানতে পারে।

চলবে?

কেমন লাগলো অবশ্যই জানাবেন।

Write a comment ...

Write a comment ...

story universe ( স্নেহার ডায়রি)

Pro
A proud pratilipi bengali writer