ইউভানের সেই গভীর আর বাঁকা হাসির মাঝে মিহিরিমার বুকটাও ধকধক করছিল। ঠিক তখনই আয়রা দৌড়ে এসে ইউভানের ট্রাউজার টেনে ধরে আধো-আধো গলায় চেঁচিয়ে উঠল, "পাপা! মাম্মা! দেখো, পাখির বাচ্চাটা উড়ে গেল!"
বাচ্চার ডাকে দুজনের ধ্যান ভাঙল। ইউভান একচিলতে হেসে মিহিরিমার কোমর থেকে হাত সরিয়ে নিল। মিহিরিমা এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে দ্রুত সোজা ঘরের দিকে পা বাড়াল, কিন্তু ইউভান স্পষ্ট দেখতে পেল তার বেবীগার্লের দু লাল হয়ে যাওয়া কান আর ঠোঁটের কোণের লুকোনো লজ্জা।
ঠিক তার দুদিন পর,
ইউভান বাথরুমে গিয়েছিল স্নান করতে। কিন্তু ফুসফুসের ক্ষত আর নিউমোনিয়ার ধাক্কায় সে তখনও পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি। শাওয়ারের কুসুম গরম জল গায়ে পড়তেই হঠাৎ দুর্বলতায় তার পা দুটো টলে উঠল। সাবানের ফেনা আর শাওয়ারের জলের মাঝে কোনোমতে নিজেকে সামলাতে না পেরে সে বাথরুমের দেওয়ালে হেলান দিয়ে সশব্দে একটা গ্র্যাব বার চেপে ধরল।
বাইরে থেকে ভারী কিছু পড়ার শব্দ আর ইউভানের মৃদু কোঁকানি শোনামাত্রই মিহিরিমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল! সে কোনো কিছু না ভেবেই এক ধাক্কায় বাথরুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ঝরনার জলের নিচে ইউভান তখন খালি গায়ে দাঁড়িয়ে, ভিজে চুল থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে তার ফর্সা, পুরুষালি শরীরে। মিহিরিমা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেও পরক্ষণেই দৌড়ে গিয়ে ইউভানের একটা চওড়া বাহু নিজের কাঁধের ওপর তুলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
"তুমি পাগল নাকি?! একা একা স্নান করতে কে বলেছিল তোমাকে?!" মিহিরিমা ভেজা তোয়ালে নিয়ে ইউভানের বুক আর পিঠ মুছিয়ে দিতে দিতে উৎকণ্ঠায় চিৎকার করে উঠল।
ইউভান মিহিরিমার এই হঠাৎ উষ্ণ স্পর্শে নিস্তেজ হয়ে পড়া শরীরটাতেও এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করল। তার চোখ দুটো গাঢ় হয়ে এলো। মিহিরিমার ভিজে যাওয়া কাপড় আর সুবাসিত উপস্থিতিতে ইউভানের সুপ্ত আকর্ষণ জেগে উঠল। সে সব দুর্বলতা ভুলে এক ঝটকায় মিহিরিমার সরু কোমরটা টেনে নিয়ে বাথরুমের ঠান্ডা টাইলসের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে তাকে আটকে ফেলল!
"ইউভান... ছাড়ো আমাকে, ভিজে যাচ্ছ তো!" মিহিরিমা বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে ইউভানের বুকে হাত দিল।
ইউভান বাঁকা হেসে মিহিরিমার কানের কাছে মুখ এনে নিচু, ভারী গলায় ফিসফিস করে বলল, "আমার আর কোনো ওষুধ চাই না, বেবীগার্ল... তুই কাছে থাকলেই আমার সব রোগ ভালো হয়ে যায়..."
ইউভানের ঠোঁট দুটো মিহিরিমার ঘাড় আর গালে পরম আদরে নেমে আসার উপক্রম হতেই মিহিরিমার মাথাটা হঠাৎ তীব্রভাবে শূন্যে চক্কর দিয়ে উঠল। চোখের সামনে চারপাশটা ধোঁয়াটে হয়ে এলো, গলার কাছে তীব্র গা-গোলানো ভাব!
"ইউ-ইউভান..." মিহিরিমার কণ্ঠ থেকে কেবল এক ক্ষীণ আওয়াজ বের হলো, আর পর মুহূর্তেই সে চোখ বুজে ইউভানের বুকের ওপর ঢলে পড়ে জ্ঞান হারাল!
"মিহিরিমা?!" ইউভানের মুখ মন্ডল আতঙ্কে রূপ নিল। সে চিৎকার করে এক বাহুতে মিহিরিমাকে শুইয়ে এনে তোয়ালে জড়িয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল।
আধঘণ্টার মধ্যে পারিবারিক ডক্টর ভিলাতে এসে পৌঁছালেন। মিহিরিমাকে স্যালাইন দিয়ে ডক্টর বেডরুমের বাইরে এলেন।
ইউভান অস্থির হয়ে হলের সোফায় পায়চারি করছিল। ডক্টরকে দেখে সে একছুটে এগিয়ে এলো, "ডক্টর, ও কেমন আছে? কী হয়েছে ওর?! কোনো ইনফেকশন বা..."
ডক্টর হালকা হেসে ইউভানের কাঁধে হাত রাখলেন, "শান্ত হন মিস্টার ডিউক। চিন্তার কিছু নেই। অতিরিক্ত দুর্বলতা, মানসিক চাপ আর মেটারনিটি স্ট্রেসের কারণে উনি জ্ঞান হারিয়েছিলেন। শী ইজ ফোর উইকস প্রেগন্যান্ট! অভিনন্দিত, আপনি আবার বাবা হতে চলেছেন।"
কথাটা শোনামাত্র ইউভানের পায়ের তলার মাটি যেন থমকে গেল! তার বরফশীতল নীল চোখ দুটো ধীরগতিতে বড় হয়ে গেল।
চার মাস আগের সেই ম্যানশনের রাত... এই মানসিক যন্ত্রণার মাঝে মিহিরিমা তাদের অনাগত সন্তানকে পেটে নিয়ে একা লড়াই করছিল, আর সে কিনা বাথরুমে তার সাথে নিজের চাহিদা পূরণ করতে চাইছিল?!
অপরাধবোধে ইউভানের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে পুরোপুরি চুপ হয়ে গেল। কোনো আনন্দের চিহ্ন তার মুখে ফুটে উঠল না, বরং এক গভীর অপরাধবোধের নীরবতায় সে ঘরের এক কোণে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মিহিরিমার চোখের ওপর তীব্র অলোর ছটা পড়তেই সে চোখ পিট পিট করে খুলল। এক সপ্তাহ আগে হলেও সে ভাবতো তার গর্ভের শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত কিন্তু আজ তার সেই অনুভূতি হলো না।
মিহিরিমার জ্ঞান ফিরতেই সে দেখতে পেল ইউভান জানালার পাশে হাত দুটো পকেটে গুঁজে নিঝুম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে-মুখে কোনো হাসি নেই, চরম বিষাদ একটা ভাব।
মিহিরিমা স্যালাইনের হাতটা কপালে রেখে ধীরপায়ে উঠে বসল। সে বুঝতে পারল ইউভান কী ভাবছে।
মিহিরিমা বিছানা থেকে নেমে এসে শক্ত পায়ে ইউভানের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর পেছন থেকে ইউভানের শক্ত কোমরটা দু'হাতে জড়িয়ে ধরে তার পিঠে মাথা রাখল।
"তুমি কি একটুও খুশি হওনি, ইউভান?" মিহিরিমার গলা সামান্য ভেঙে এলো। "নাকি আবার ভাবছ যে আমি এই বাচ্চাটার জন্য তোমাকে দোষ দেব? আমি তো তোমার ওপর আর রাগ করে নেই ইউভান... তবুও তুমি এমন চুপ করে আছ কেন?"
মিহিরিমা জানে না তার কি হচ্ছে আজকাল বেশি ইমোশনাল হয়ে পড়ছে। তার মনের মধ্যে ইনসিকিউরিটি কাজ করছে বেশ কিছু দিন ধরেই। সে আর মিহিরিমা নেই যার প্রতি ইউভান পাগল ছিল। তার মুখ পাল্টে গিয়েছে। মাতৃত্বের ফলে শরীরে মেদ জমেছে অথচ, ৪০ ঊর্ধ্বে ইউভান এর নজরকাড়া পুরুষালি ব্যক্তিত্ব দেখলে যে কোনো মেয়ে মাথা ঘুড়ে যাবে।
ইউভান ধীরপায়ে ঘুরে দাঁড়াল। মিহিরিমার চোখের কোণে জমে থাকা জল আর তার চেহারায় ফুটে ওঠা অদ্ভুত এক নিরাপত্তাহীনতার ছাপ দেখে ইউভানের বুকে তীব্র এক যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠল। সে মিহিরিমার দু গাল নিজের চওড়া, উত্তপ্ত হাতের তালুতে তুলে নিল।
"আমি খুশি হইনি?!" ইউভানের গলাটা কান্নায় সামান্য বুজে এলো, নীল চোখ দুটো আত্মগ্লানি আর অগাধ ভালোবাসায় টলমল করছিল। "আমি তোমার ওপর কোনো অন্যায় করতে চাইনি, রিমা... তোমাকে আর কোনো যন্ত্রণায় ফেলতে চাইনি। চার মাস আগে ম্যানশনের সেই রাতে ... আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলাম না, বেবীগার্ল! তাই নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল।"
মিহিরিমা চোখের পাতা ফেলে দু ফোঁটা জল গাল বেয়ে ঝরিয়ে দিল। সে ইউভানের চোখ থেকে চোখ সরাতে পারছিল না।
"তুমি সত্যি বলছ, ইউভান?" মিহিরিমার কণ্ঠে চরম এক অসহায়ত্ব ফুটে উঠল, যা সে এতদিন নিজের ভেতর চেপে রেখেছিল। "তোমার কি আমাকে আর আগের মতো সুন্দর লাগে না? আমার মুখটা বদলে গেছে... শরীরের গঠন বদলে গেছে... আয়রাকে জন্ম দেওয়ার পর, এই আবার মা হতে যাওয়ার পর আমি আর আগের সেই মিহিরিমা নেই। আমার আজকাল খুব ভয় হয় ইউভান..."
কথাগুলো শেষ করতে পারল না মিহিরিমা, তার কণ্ঠ কান্নার তোড়ে আটকে গেল।
ইউভান স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত। মিহিরিমার মতো শক্ত মনের মেয়েটা যে নিজের রূপ আর শরীর নিয়ে এত বড় একটা ইনসিকিউরিটিতে ভুগছে, তা ইউভানের ধারণার বাইরে ছিল!
ইউভান এক ঝটকায় মিহিরিমাকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে লেপ্টে নিল। তার শক্ত পুরুষালি ঠোঁট দুটো মিহিরিমার কপালে গভীর ও ব্যাকুল স্পর্শে চেপে বসল।
"Are you mad বেবীগার্ল?!" ইউভান মিহিরিমার কানের কাছে নিচু, ভালোবাসা মাখানো গম্ভীর গলায় ফিসফিস করে উঠল। "লারা, এলিনা কিংবা এই দুনিয়ার সমস্ত সুন্দরী মেয়েদের যদি আমার পায়ের নিচে এনে রাখা হয়, তাও এই ইউভান ডিউকের চোখ কেবল তোমাকেই খুঁজবে! তুমি মুখ পাল্টেছ, তোমার শরীর বদলেছে... কিন্তু তোমার ভেতরে স্পন্দিত হওয়া ওই আত্মাটা, ওই স্পর্শটা তো আমার মিহিরিমারই!"
ইউভান মিহিরিমার ফর্সা পেটের কাছে হাত নিয়ে পরম ভালোবাসায় নিজের হাতের তালু রাখল।
"তোমার এই শরীরের প্রতিটা পরিবর্তন, এই মেদ, এই মাতৃত্বের ছাপ—এগুলো আমার ভালোবাসার চিহ্ন, আমার দেওয়া উপহার। দুনিয়ার চোখ তোমার মুখ দেখে মিহিরিমা, কিন্তু ইউভান ডিউক তোমাকে দেখার জন্য চোখ ব্যবহার করে না, মন দিয়ে দেখে। তোমাকে ছোঁয়ার আগে আমি হাজারবার ভাবি যাতে আমার বেবীগার্ল কষ্ট না পায়... সেখানে অন্য কোনো নারীর চিন্তা আমার মাথায় আসা মানে আমার নিজের অস্তিত্বকে অপমান করা!"
মিহিরিমা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ইউভানের সোয়েটারের কলার চেপে ধরে তার চওড়া বুকে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। এতদিন ধরে জমে থাকা সব ভয়, ইনসিকিউরিটি আর আবেগ এক নিমেষে অশ্রু হয়ে ধুয়েমুছে গেল।
ইউভান বাঁকা হেসে মিহিরিমার থুতনিটা ওপরে তুলে ধরে তার ঠোঁটে পরম শান্তিতে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
"এখন থেকে প্রতিদিন তোমাকে মনে করিয়ে দেব যে তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আর একমাত্র আকর্ষণ," ইউভান গাঢ় চোখে মিহিরিমার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল। "আর কোনো বাইরের মেয়ে যদি তোমাকে ভয় দেখায়, তবে আমি কালকেই ডেভিডকে বলে এই পুরো নেবারহুড কিনে নেব!"
মিহিরিমা কান্নার মাঝেই খিলখিল করে হেসে উঠল, আর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা আয়রা আবার হাততালি দিয়ে বলে উঠল, "পাপা আবার মাম্মাকে
চুমু দিয়েছে!"
চলবে?
কেমন লাগছে অবশ্যই বলবেন!



Write a comment ...