গাড়ি যখন ইউভানের বিশাল, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকা প্রাইভেট ম্যানশনের সামনে এসে থামল, তখন রাত আরও গভীর। গাড়ির দরজা খুলে বডিগার্ডরা যখন বাইরে দাঁড়াল, মিহিরিমার ভেতরের জমে থাকা ভয়টা এবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল।
ইউভান গাড়ি থেকে নেমে আয়রাকে কোলে নিয়েই ভেতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই, মিহিরিমা এক ঝটকায় ইউভানের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখন আর কোনো ভয় নেই, আছে কেবল জ্বলন্ত আক্রোশ আর ঘৃণা।
"এক পা-ও এগোবে না ইউভান!" মিহিরিমা তীক্ষ্ণ, কাঁপতে থাকা গলায় চিৎকার করে উঠল। "তুমি ভেবেছ গায়ের জোরে আমাকে আর আমার মেয়েকে বন্দি করে রাখবে? তুমি একটা জানোয়ার, একটা খুনি! পাঁচ বছর আগে আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছিল তোমার পরিবার, এখন আবার এসেছ আমাদের জীবন কে তোমারা শেষ করে দিতে ! তোমার ওই রক্তমাখা হাত দিয়ে আমার মেয়েকে ছোঁয়ার কোনো অধিকার তোমার নেই!"
ইউভানের পদক্ষেপ থমকে গেল। সে স্থির দৃষ্টিতে মিহিরিমার দিকে তাকিয়ে রইল।
"তুমি স্বার্থপর, ইউভান! তুমি শুধু নিজের ক্ষমতা আর জেদ বোঝো!" মিহিরিমার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল পড়ছিল। "লারাকে নিয়ে তুমি তোমার জীবন সাজিয়েছ, আর আমি এই পাঁচটি বছর তিল তিল করে মরেছি! নিজের চেহারা অস্তিত্ব বদলেছি।একা একটা মেয়েকে বড় করেছি! আর আজ তুমি এসেছ অধিকার ফলাতে? জাস্ট লিভ আস অ্যালোন! আমি তোমাকে ঘৃণা করি... আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যাও!"
রাতের সেই নিস্তব্ধতায় মিহিরিমার প্রতিটা শব্দ যেন ধারালো ছুরির মতো ইউভানের বুকে বিঁধল। তার সেই পাথরের মতো শক্ত চোয়ালটা এক মুহূর্তের জন্য যেন কেঁপে উঠল। চোখের সেই পৈশাচিক, রক্তবর্ণ আভা গলে গিয়ে সেখানে নেমে এলো এক অদ্ভুত, ভাঙাচোরা শূন্যতা।
ইউভান কোনো প্রতিবাদ করল না, কোনো সাফাই গাইল না। সে চোখ নামিয়ে তার বুকের কাছে কুঁকড়ে থাকা ঘুমন্ত আয়রার মুখের দিকে একবার তাকাল। তারপর অত্যন্ত ধীর, আলতো হাতে আয়রাকে মিহিরিমার কোলের দিকে বাড়িয়ে দিল।
মিহিরিমা হকচকিয়ে গেল। সে দ্রুত আয়রাকে নিজের বুকে টেনে নিল।
"ঠিক আছে," ইউভানের গলাটা বড্ড শান্ত, বড্ড নিস্তেজ আর শ্রান্ত শোনাল। "তুমি যদি আমাকে এতটাই ঘৃণা করো, তবে আমি তোমাকে জোর করব না ।"
ইউভান এক পা পিছিয়ে গেল। তারপর নিজের বডিগার্ডদের দিকে ফিরে বরফশীতল গলায় নির্দেশ দিল, "ওঁদের এক্ষুনি সসম্মানে ভিলাতে পৌঁছে দাও। রাস্তায় যেন কোনো আঁচ না লাগে।"
মিহিরিমা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত। যে ইউভান কিছুক্ষণ আগে জেকবের পায়ে গুলি করতে দু'বার ভাবেনি, যে ইউভান তাকে জোর করে তুলে আনল, সে এত সহজে তাকে ছেড়ে দিল? কিন্তু মিহিরিমা আর কোনো চিন্তা না করে দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি আবার লেকসাইড ভিলার দিকে রওনা দিল।
ভিলার সামনে যখন গাড়ি পৌঁছাল, তখন চারদিক নিঝুম। ড্রয়িংরুমের সেই ভাঙা কাঁচের দরজাটা পার হয়ে ভেতরে ঢুকতেই মিহিরিমার বুকটা ধক করে উঠল। জেকবের রক্তের দাগ তখনও মেঝেতে স্পষ্ট। মিহিরিমা দ্রুত আয়রাকে নিয়ে বেডরুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা শক্ত করে লক করে দিল।
বিছানায় আয়রাকে শুইয়ে দিয়ে সে নিজেও ফ্লোরে বসে পড়ল। তার মনে হতে লাগল, যাক, অবশেষে ইউভানের জেদ ভেঙেছে। ও হয়তো বুঝেছে যে ওর আর কোনো জায়গা নেই আমার জীবনে। ও আমাকে চিরকালের মতো মুক্তি দিয়েছে।
কিন্তু মিহিরিমার সেই ধারণা যে কতটা ভুল ছিল, তা সে বুঝল পরদিন সকালে।
সারা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি মিহিরিমা। ভোরের আলো ফুটতেই সে জানালার পর্দাটা সামান্য সরিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। আর সেই দৃশ্য দেখে তার বুকের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল!
নিউজিল্যান্ডের কনকনে ঠান্ডা হাওয়া, চারদিক ভারী কুয়াশায় মোড়া। আর সেই ভাঙা গ্লাস ডোরের ঠিক বাইরে, ভিলার গেটের সামনে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে একটা মানুষ—ইউভান ডিউক।
পরনে কাল রাতের সেই একই কালো কোট, চুলগুলো রাতের শিশিরে আর কুয়াশায় ভিজে লেপ্টে আছে। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে মিহিরিমার জানালার দিকেই।
মিহিরিমা ভাবল, কিছুক্ষণ পরেই হয়তো চলে যাবে। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো, কুয়াশা কেটে গিয়ে রোদ উঠল, আবার বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামল। কিন্তু ইউভান এক ইঞ্চিও জায়গা থেকে নড়ল না। সে ভেতরে ঢোকার কোনো চেষ্টাও করল না, দরজাও খটখট করল না, আবার ফিরেও গেল না।
সে কেবল তার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একদৃষ্টে ভিলার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যেন এক নিঃশব্দ, ভয়ংকর কিন্তু ব্যাকুল পাহারাদার—যে তার পুরো পৃথিবীকে আগলে রাখতে নিজের জীবন বাজি রেখে দরজার বাইরে অনন্তকাল দাঁড়িয়ে থাকতে প্রস্তুত, শুধু একটুখানি অধিকার ফিরে পাওয়ার আশায়।
মিহিরিমার ঘরের ভেতরের অস্থিরতা ততক্ষণে চরমে পৌঁছে গেছে। টানা এতগুলো ঘণ্টা কোনো খাবার নেই, জল নেই, কনকনে বরফ হাওয়ার মধ্যে ইউভান ওভাবে দরজার বাইরে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে!
কখনও লেকের ঠান্ডা বাতাস এসে ওর ভেজা কোটটাকে ঝাপটা মারছে, কখনও কুয়াশার বিন্দু জমে উঠছে ওর চোখের পাপড়িতে। কিন্তু ইউভানের নজর একটাবারও জানালার থেকে সরেনি।
অবশেষে আর সহ্য করতে না পেরে মিহিরিমা একঝটকায় ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। তার রাগ আর বিরক্তি যেন বাঁধ মানছিল না। দ্রুত পায়ে ইউভানের কয়েক গজ দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে মিহিরিমা চিৎকার করে উঠল—
"তুমি কী করছ এখানে, ইউভান?! পাগল হয়ে গেছ তুমি?! সারাদিন ধরে ওভাবে কুকুরের মতো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছ কেন?!"
ইউভান একটুও নড়ল না। মিহিরিমার চিল চিৎকার বা রাগের মুখে ওর চোখের পাতাও ফেলল না। বেশ কিছুক্ষণ পর, ঠান্ডায় বসে যাওয়া ভারী ও ভাঙা গলায় অত্যন্ত মন্থর ভঙ্গিতে কথা বলল ইউভান।
ওর চোখ দুটো রক্তবর্ণ, ঠোঁট দুটো ঠান্ডায় জমে নীল হয়ে এসেছে।
"তুমি যতক্ষণ না আমাকে মাফ করছ .." ইউভান এক পা এগোতে গেল, কিন্তু শরীরটা সামান্য টলে উঠল। নিজেকে সামলে নিয়ে আবার মিহিরিমার চোখের দিকে তাকিয়ে নিস্তেজ কিন্তু একরোখা গলায় বলল, "...ততক্ষণ এই ইউভান ডিউক এখান থেকে এক পা-ও নড়বে না।"
"তুমি নাটক বন্ধ করো!" মিহিরিমা হাত উঁচিয়ে গর্জে উঠল। "তোমার এই জেদ আর ব্ল্যাকমেলিং আমি ভালো করেই চিনি! আমার মন কোনোদিন গলবে না! মরে গেলেও না!"
ইউভান মিহিরিমার দিকে তাকিয়ে থমথমে ভঙ্গিতে একটা ফিকে হাসি হাসল।
"এটা নাটক নয়, বেবীগার্ল," ইউভান অত্যন্ত শান্ত কিন্তু তীব্র ব্যাকুলতায় ফিসফিস করে উঠল।
মিহিরিমার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত দোলাচলে মুচড়ে উঠল। রাগ, হিংসা, আর জমে থাকা ঘৃণা একদিকে—আর অন্যদিকে ইউভানের এই আত্মঘাতী জেদ!
ইউভান মিহিরিমার কোনো জবাবের অপেক্ষা না করে আবার আগের মতো নিঃশব্দে জানালার দিকে মুখ করে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
মিহিরিমা হাঁপাতে হাঁপাতে উল্টো ঘুরে ঝড়ের বেগে ঘরের ভেতরে ঢুকে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল। কিন্তু ঘরের ভেতরে এসেও তার বুকের ভেতরের ঝড়টা আর থামল না—জানালার বাইরে তখনও দাঁড়িয়ে ছিল এক জেদি রাজা, যে তার হারানো রাজ্য ফিরে পেতে নিজের অস্তিত্ব বাজি রেখে দিয়েছে।
চলবে?



Write a comment ...