86

Come with me💔

মিহিরিমা তখন দিশেহারা হয়ে ট্যাক্সি চেপে সোজা ফিরে এসেছে লেকসাইড ভিলায়। তার বুকের ভেতরটা এক অনিয়ন্ত্রিত ঝড়ের তোড়ে কাঁপছিল। ঘরের আলো না জ্বালিয়েই সে একছুটে চলে গেল আয়রার বিছানার পাশে। নিষ্পাপ বাচ্চাটা এক শান্ত পরীর মতো ঘুমোচ্ছে।

মিহিরিমা হাঁটুমুড়ে মেঝের ওপর বসে আয়রার ছোট ছোট হাত দুটো চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল।

"কেন এলে ইউভান? কেন আবার আমার এই সাজানো শান্ত জীবনটাকে ছারখার করতে এলে?!" তার কণ্ঠ থেকে ফিসফিসানি নয়, যেন এক গভীর আর্তনাদ বের হচ্ছিল।

একদিকে অ্যালকোহলের ঝিমঝিমুনি, অন্যদিকে ইউভানের সেই ব্যাকুল ছোঁয়া আর আক্রোশের আঘাত—মিহিরিমার মনে হচ্ছিল তার মস্তিষ্ক ছিঁড়ে যাবে। সে জানত, ইউভান যখন কুইন্সটাউনে এসে পৌঁছেছে তাকে চিনে ফেলেছে সে। হয়তো আয়রার কথাও  জানে , সে আয়রাকে কেড়ে নিতে এক সেকেন্ডও ভাববে না। সে সিদ্ধান্ত নিল, কাল ভোরেই সে আয়রাকে নিয়ে নিউজিল্যান্ড ছেড়ে বহুদূরে অন্য কোনো অচেনা দেশে হারিয়ে যাবে—যেখানে ইউভান ডিউকের দীর্ঘ ছায়াও কোনোদিন পৌঁছাতে পারবে না।

রাত তখন আনুমানিক ২টো। বাইরের কনকনে হাওয়া লেক ওয়াকাটিপুরের বুকে আছড়ে পড়ছে।

হঠাৎই ভিলার শান্ত পরিবেশ ভেদ করে চুরমার হয়ে গেল ড্রয়িং রুমের মেইন গ্লাস ডোর! ভাঙা কাঁচের বিকট শব্দে থরথর করে কেঁপে উঠল পুরো ঘর!

ঘুমন্ত আয়রা ভয়ে আঁতকে উঠে কেঁদে ফেলল, "মাম্মা! মাম্মা!"

মিহিরিমা বুক দিয়ে আয়রাকে আগলে ধরে শক্ত হয়ে বসে রইল। তার হৃদস্পন্দন যেন থমকে গেছে।

ধীর, ভারী আর বরফশীতল পদক্ষেপের শব্দ করিডোর বেয়ে এগিয়ে আসতে লাগল ড্রয়িং রুমে এর দিকে।

দরজাটা এক ঝটকায় খুলে গেল। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে এক দানবীয় ছায়ামূর্তি—ইউভান ডিউক।

তার পরনের কালো কোটটা বাতাসে সামান্য উড়ছে, চোখ দুটো রক্তবর্ণ, আর বাঁ গালে মিহিরিমার দেওয়া সেই চার ঘণ্টা আগের চড়ের লাল দাগটা এখনও স্পষ্ট। তার এক হাতে একটা স্মোকিং সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল।

ইউভানের ঠিক পেছনেই সিকিউরিটির হাতে বাঁধা অবস্থায় মেঝেই টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসা হয়েছে  জেকবকে! জেকবের মুখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে, তার চশমা ভাঙা। ইউভানের লোকজন জেকবকে এক ধাক্কায় ঘরের মেঝের ওপর ফেলে দিল।

"ইউ-ইউভান?!" মিহিরিমা চিৎকার করে উঠল। "তুমি... তুমি আমার ঘরে এই রাতে কী করছ?!"

ইউভান ঘরের আলো না জ্বালিয়ে ধীরপায়ে ভেতরে হেঁটে এলো। তার উপস্থিতি পুরো ঘরটাকে এক মুহূর্তে গুমোট আর দমবন্ধ করে তুলল। সে মিহিরিমার দিকে একবিন্দুও তাকাল না, কোনো ব্যাখ্যার পরোয়াও করল না। তার নজর সোজা মেঝেই পড়ে থাকা ভীতসন্ত্রস্ত জেকবের ওপর।

কোনো কথা না বাড়িয়ে, কোনো ওয়ার্নিং না দিয়ে ইউভান সোজাসুজি পিস্তল উঁচিয়ে জেকবের পায়ে এক বিকট ব্ল্যাঙ্ক ফায়ারিং করল!

"আআআআআঘঘঘঘঘ!" জেকব মেঝেই আছড়ে পড়ে গগনবিদারি আর্তনাদ করে উঠল। রক্তে ভেসে যেতে লাগল ঘরের শীতল ফ্লোর।

মিহিরিমা আতঙ্কে আয়ারার দুই হাতে মুখ ঢেকে বিকট চিৎকার করে উঠল। ইউভান কি পাগল হয়ে গেছে? আক্ষরিক অর্থেই এক পৈশাচিক খুনিতে পরিণত হয়েছে ও?!

কিন্তু ইউভানের মুখে কোনো অনুশোচনা বা উত্তেজনার ছাপ ছিল না। সে পিস্তলটা শান্ত ভঙ্গিতে কোটের পকেটে রেখে ধীরপায়ে মিহিরিমার দিকে এগিয়ে এলো।

মিহিরিমার কাছ থেকে তবে কান্নাকাটি করা আয়রাকে ইউভান এক অনায়াস টানে নিজের চওড়া বুকের ভেতর তুলে নিল। পরম মমতায় কিন্তু এক একরোখা অধিপতির মতো বাচ্চাটাকে নিজের সাথে পেঁচিয়ে ধরল সে।

মিহিরিমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল! তার হাত-পা থরথর করে কাঁপতে লাগল। ইউভান আয়রাকে চিনে ফেলল কীভাবে?! ও তো কোনদিন আয়রাকে দেখেনি! ও কীভাবে জানল আয়রা ওরই সন্তান?! সে তো মারিয়া সকলের কাছে!

"তু-তুমি... ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?! ছাড়ো আমার মেয়েকে!" মিহিরিমা ভয়ে তোতলাতে তোতলাতে ইউভানের কোট চেপে ধরতে গেল।

ইউভান মিহিরিমার দিকে এক বরফশীতল, কঠোর ও অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক অথচ অধিকারবোধের আভা।

সে মিহিরিমার কোনো প্রশ্নের উত্তর দিল না। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার কোনো সাফাই বা কোনো প্রমাণ সে মিহিরিমার সামনে তুলে ধরল না। শুধু থমথমে ও গম্ভীর গলায় একটা কথাই বলল—

"মারিয়া ক্লার্ক ? হুহ হঠাৎ সিঙ্গল মাদার কবে হলে তুমি? মিসেস মিহিরিমা ডিউক তাই তো? মুখ বদলালেও সব কিছু ঠিক আগের মতোই। ইউভান নেশাক্ত ভঙ্গিতে  মিহিরিমার চুলের মাঝে লম্বা শ্বাস নিল। প্রথম দিনই তোমায় চিনে গিয়েছিলাম শুধু প্রমাণ জোগাড় করতে সময় লেগে যায় তোমার তথাকথিত প্রেমিক এর কাছ থেকে।

আমার সন্তান আমার সাথে থাকবে। আর তুমিও"

"ইউভান প্লিজ! এমন কোরো না! আমি তোমার সাথে কোথাও যাব না!" মিহিরিমা কেঁদে উঠে আকুতি জানাতে লাগল।

কিন্তু ইউভান তার কোনো আকুতি কানেই তুলল না। সে এক হাতে শক্ত করে আয়রাকে বুকের সাথে ধরে রেখে, অন্য হাত দিয়ে মিহিরিমার কবজি এক চরম পাশবিক ও শক্ত বাঁধনে চেপে ধরল।

"তোমার ইচ্ছে চাওয়া না-চাওয়ার ওপর ইউভান ডিউক চলে না, মিহিরিমা," ইউভানের গলাটা এত নিস্তেজ কিন্তু ভয়ংকর শোনালো যে মিহিরিমার গলার আওয়াজ বুকের ভেতরই আটকে গেল।

মিহিরিমা সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়ল। একদিকে মেঝেই রক্তের সাগরে ছটফট করতে থাকা জেকব, অন্যদিকে আয়রার নিরাপত্তা, আর সামনে এক জেদি, হিংস্র পুরুষ—যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত।

কোনো উপায় না পেয়ে, নিজের বাচ্চার সুরক্ষার তাগিদে মিহিরিমা বাধ্য হয়ে ইউভানের সাথে পা বাড়াল।

ইউভান মিহিরিমাকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে ভিলার বাইরে নিয়ে এলো। বাইরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে চারটে কুচকুচে কালো বিলাসবহুল গাড়ি।

মিহিরিমাকে গাড়ির পেছনের সিটে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে বসিয়ে দিয়ে ইউভান নিজেও আয়রাকে কোলে নিয়ে পাশে বসে পড়ল। গাড়িটি নিমেষের মধ্যে লেকসাইড ভিলা ছেড়ে ইউভানের নিউজিল্যান্ডের নিজস্ব প্রাইভেট ম্যানশনের দিকে দ্রুতগতিতে ছুটে চলল।

গাড়ির পেছনের সিটে ইউভান আর মিহিরিমার মাঝে কেবল এক অদ্ভুত, থমথমে নীরবতা। মিহিরিমা জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে নিভৃতে জল ফেলছিল, আর পাশে বসে থাকা ইউভান একহাতে বাচ্চাটাকে আঁকড়ে ধরে অন্যহাতে মিহিরিমার কাঁপা হাতটা কোনো কথা না বলেই নিবিড়ভাবে চেপে রাখা। ইউভান মিহিরিমার আঙুল গুলো ঠোঁটে ছোঁয়াতেই এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার চোখ বেয়ে।

চলবে?

Write a comment ...

Write a comment ...

story universe ( স্নেহার ডায়রি)

Pro
A proud pratilipi bengali writer