কাগজের সেই অস্পষ্ট ছবিটার দিকে তাকিয়ে মিহিরিমার বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ মরুভূমি হয়ে গিয়েছিল। জেকব পরম দরদী সাজে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, মিহিরিমার মনের এই ক্ষত আর ভাঙা আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে সে আয়রার ভবিষ্যৎ ও সুরক্ষার দোহাই দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসে।
কিন্তু মিহিরিমার অবচেতন মন প্রথম ধাক্কাতেই জেকবের হাত ধরতে পারেনি। সে কাঁপা গলায় আরও কিছুটা সময় চেয়ে নিয়েছিল। জেকবও বিজয়ের পৈশাচিক আনন্দ চেপে রেখে তাকে সময় দিল।
দেখতে দেখতে আরও তিনটি দীর্ঘ মাস ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে খসে পড়ল।
এই নব্বইটা দিনের প্রতিটা রাত মিহিরিমা লেক ওয়াকাটিপুরের ঠান্ডা হাওয়া গায়ে মেখে একটাই পথ চেয়ে বসে থেকেছে—যদি অলৌকিক কোনো উপায়ে ইউভান এসে দাঁড়ায়, যদি বলে সব মিথ্যা ছিল! কিন্তু কোনো বার্তা আসেনি। কোনো ছায়াও এসে দাঁড়ায়নি সেই ভিলার সীমানায়। ধীরে ধীরে মিহিরিমার ভেতরের জমাট বাঁধা বিশ্বাসের শেষ প্রদীপটুকুও বাতাসে নিভে ছাই হয়ে গেল। সে নিজের মনকে বুঝিয়ে নিল, ইউভান তার নতুন সংসার আর ক্ষমতার রাজত্ব নিয়ে ব্যস্ত; সে কেবলই এক ফেলে আসা অতীত। অবশেষে ছোট্ট আয়রার একটা নিরাপদ পরিচয় আর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মিহিরিমা তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন আর অনাকাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলল—সে জেকবকে বিয়ে করবে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরদিন রাত। কুইন্সটাউনের এক অতি-অভিজাত প্রাসাদোপম হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে আয়োজন করা হয়েছিল এক জমকালো পার্টির। ডক্টর জেকবের সহকর্মীদের আমন্ত্রণে সেই পার্টিতে যোগ দিতে হয়েছিল মিহিরিমাকে। চার বছরের ছোট্ট আয়রাকে ভিলায় বিশ্বস্ত কেয়ারটেকারের কাছে ঘুমে রেখে মিহিরিমা পার্টিতে এসে পৌঁছেছিল।
বলরুমের ভেতরে তখন আলোর রোশনাই আর আভিজাত্যের প্রদর্শনী। সুউচ্চ ক্রিস্টাল গ্লাসে শ্যাম্পেনের লালচে বুদ্বুদ, ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকা ভারী মেলোডিয়াস ভায়োলিনের সুর আর চারপাশের মানুষের কৃত্রিম অট্টহাসি—সবকিছু মিহিরিমার দম বন্ধ করে আনছিল। পরনে এক সাধারণ কিন্তু রাজকীয় ফিকে গোলাপি গাউন, চোখের নিচে গভীর বিষাদের ছায়া। নিজেকে এই অনভিপ্রেত পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে সে ধীরপায়ে বার-কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল।
বুকের ভেতর জমে থাকা চার মাসের বোবা কান্না আর সিদ্ধান্তহীনতার দমবন্ধ যন্ত্রণা থেকে এক মুহূর্তের মুক্তি পেতে মিহিরিমা কাউন্টার থেকে এক গ্লাস কড়া অ্যালকোহল তুলে নিল। এক চুমুকে সেই তপ্ত তরল গলার নিচে ঢেলে দিতেই অ্যালকোহলের ঝাঁঝালো উত্তাপ তার বুক চিরে নেমে গেল, মাথাটা হালকা ঝিমঝিম করে উঠল।
গ্লাসটা কাউন্টারে নামিয়ে রেখে চোখের পাতা দুটো হালকা মেলতেই—হলের সুদূর এক আধো-অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুরুষালি অবয়বের ওপর মিহিরিমার দৃষ্টি স্থাণু হয়ে গেল।
কালো থ্রি-পিস স্যুট, চুলে এলোমেলো কিন্তু অভিজাত ছাঁট, এক হাতে গ্লাস ধরে অত্যন্ত মন্থর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মূর্তিটার চোখ দুটো সরাসরি তার দিকেই নিবদ্ধ।
ইউভান ডিউক!
মিহিরিমার হাত থরথর করে কেঁপে উঠল। তার হাতের স্পর্শে থাকা ফাঁকা কাঁচের গ্লাসটা কাউন্টার থেকে গড়িয়ে মার্বেলের ফ্লোরে পড়ে বিকট শব্দে চুরমার হয়ে ছড়িয়ে পড়ল!
হলের লোকজনের মনোযোগ এক মুহূর্তের জন্য সেদিকে গেলেও মিহিরিমার পৃথিবীর আলো-বাতাস যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। অ্যালকোহলের নেশা নাকি কোনো ভয়াল চোখের বিভ্রম? ইউভানের সেই বরফশীতল চোখ, চেনা চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই পৈশাচিক আকর্ষণ—ঠিক যেমনটা সে অতীতে চিনে এসেছে!
ভয়ে, বিস্ময়ে আর এক অজানা আতঙ্কে মিহিরিমার শিরদাঁড়া বেয়ে এক হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। তবে কি জেকবের দেওয়া সেই বিয়ের খবর মিথ্যা ছিল? ইউভান কীভাবে এখানে? ও কি তবে তাকে আবার শেষ করতে এসেছে?
আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি বা মানসিক ভারসাম্য মিহিরিমার ছিল না। জেকবের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে, গাউনের কুঁচিটা এক হাতে চেপে ধরে সে উল্টো ঘুরে বলরুমের পেছনের নির্জন ও আংশিক অন্ধকার সার্ভিস এক্সিটের দিকে উন্মাদের মতো দৌড়াতে শুরু করল।
ঝলমলে হলের আলো আর মিউজিকের শব্দ পেছনে ফেলে করিডোরের নিরবচ্ছিন্ন নিস্তব্ধতায় পৌঁছাতেই—অন্ধকারের আড়াল থেকে হঠাৎ দুটি পাহাড়ি চওড়া ও উষ্ণ বাহু এক অবিশ্বাস্য হ্যাঁচকা টানে মিহিরিমাকে পেছন থেকে জাপটে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল!
পিঠের পেছনে ইউভানের সেই চিরচেনা শক্ত, চওড়া বুক। আর ঘাড়ে এসে আছড়ে পড়ছে তার তপ্ত, ব্যাকুল আর অবাধ্য নিঃশ্বাসের ঝড়।
দীর্ঘ চার মাসের নরকযন্ত্রণা আর বহু বছরের না-পাওয়ার তৃষ্ণা যেন এক নিমেষে একবিন্দুতে এসে থমকে দাঁড়িয়েছিল। ইউভান তার পেশিবহুল হাত দুটো দিয়ে মিহিরিমাকে এত শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরেছিল, যেন সামান্য ঢিল দিলেই এই মায়াবী নারী আবার কোনো অদৃশ্য কুয়াশায় মিলিয়ে যাবে। ইউভান চোখ বুজে মিহিরিমার ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিল। তার চুলে জমে থাকা লেকের হাওয়ার চেনা মিষ্টি গন্ধটা বুক ভরে টেনে নিয়ে এক ভাঙা, ভারী ও আকুল গলায় ফিসফিস করে উঠল—
"বেবীগার্ল... কতগুলো বছর... কতগুলো অভিশপ্ত রাত ধরে আমি শুধু এই একটা অনুভূতির জন্য তিল তিল করে মরেছি..."
ইউভানের সেই গভীর, চেনা কণ্ঠের কাঁপুনি মিহিরিমার হৃদয়ের একদম ভেতরে এক তীব্র ভূকম্পন সৃষ্টি করল। কিন্তু ঠিক পর মুহূর্তেই তার মগজে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধে উঠল লারার সাথে তার বিয়ের সেই খবরের কাগজ, প্রতারণার স্মৃতি!
তার ভেতরের জমাট বাঁধা প্রেম এক নিমেষে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে সেখানে জেগে উঠল পরম বিষাক্ত, অন্ধ আক্রোশ আর ঘৃণা!
মিহিরিমা নিজের ভেতরের সমস্ত জমে থাকা শক্তি এক জায়গায় এনে এক চরম হিংস্র ঝটকায় ইউভানের ওই শক্তিশালী বাহুর বাঁধন ঠেলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। ইউভান চমকে উঠে আবার ব্যাকুল হয়ে তার নরম হাত দুটো ধরতে গেল—
কিন্তু মিহিরিমা এক মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইউভানের সেই রক্তবর্ণ চোখের দিকে তীব্র ঘৃণায় তাকাল।
ঠাঁইইইই!
নিস্তব্ধ নিঝুম করিডোরে এক প্রচণ্ড চড়ের শব্দ প্রতিধ্বনি হয়ে চারদিকের দেয়ালে আছড়ে পড়ল!
ইউভানের সুগঠিত মুখটা একপাশে কাত হয়ে গেল। তার ফর্সা গালে মিহিরিমার পাঁচ আঙুলের লাল ছাপ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ভেসে উঠল।
মিহিরিমার চোখ থেকে তখন বাঁধভাঙা জলের তোড় গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু তার দৃষ্টিতে কোনো ভালোবাসা ছিল না—ছিল কেবল ইউভানকে মুহূর্তের মধ্যে ছাই করে দেওয়ার মতো প্রবল ঘৃণা।
"আমাকে ছোঁওয়ার দুঃসাহস করবে না,মিস্টার ইউভান ডিউক!" মিহিরিমার গলাটা আক্রোশে আর ঘৃণায় কাঁপছিল। "লারাকে নিজের করে নিয়ে আর আমার পুরো জীবনটা বিষিয়ে দিয়েও তোমার পৈশাচিক ক্ষিধে মেটেনি, তাই না? আর যদি আমাদের জীবনে ছায়া ফেলার চেষ্টা করেছ, আমি নিজের হাতে নিজের জীবন শেষ করে দেব!"
ইউভান একবিন্দু নড়ল না। তার কিছু ব্যাখ্যা করার, নিজের নির্দোষ হওয়ার প্রমাণ দেওয়ার ক্ষমতাটুকুও যেন মিহিরিমার ওই এক চড় আর বিষাক্ত দৃষ্টি এক মুহূর্তে কেড়ে নিয়েছিল। সে কেবল পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ইউভানকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মিহিরিমা তার গাউন চেপে ধরে দ্রুত পায়ে নির্জন করিডোর পার হয়ে রাতের অন্ধকার আর কনকনে হাওয়ার মধ্যে মিলিয়ে গেল।
ইউভান গালে হাত দিয়ে মিহিরিমার হারিয়ে যাওয়া অন্ধকারের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল। তার সেই পাথরের মতো শক্ত, নির্দয় চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গাল বেয়ে সোজা মেঝের ওপর খসে পড়ল।
সে হাতের উল্টো পিঠে চোখের জলটা মুছে নিয়ে নিজের থমথমে গলায় ফিসফিস করে বলল—
"তুমি আমায় যতই ঘৃণা করো না কেন বেবি গার্ল... তোমাকে আর আমার সন্তানকে এবার আমার বুকের ভেতর ফিরিয়ে না নিয়ে, ইউভান ডিউক নিউজিল্যান্ডের এই মাটি ছেড়ে এক পা-ও নড়বে না।"
চলবে?
কেমন লাগলো অবশ্যই জানাবেন!



Write a comment ...