84

এক মাস পর!

চার্চের সুবিশাল কাঠের মূল দরজা দুটো বিকট শব্দে একসাথে বন্ধ হয়ে গেল! চার্চের পেছনে থাকা বিশাল ক্রিস্টাল স্ক্রিনটা তীব্র আলো ফেলে জ্বলে উঠল!

স্ক্রিনের তীব্র আলোয় পুরো চার্চের আবহ মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। চার্চের সুউচ্চ স্পিকারগুলোতে উচ্চশব্দে বাজতে শুরু করল কাল রাতে ম্যানশনের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে লারা আর ফারহানের করা সেই পৈশাচিক প্ল্যানিংয়ের লাইভ অডিও!

“কাল সই করার পরই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আমার নামে... ড্রাগস দিয়ে ওকে নিস্তেজ করে দেব! আর ইসাবেলাকে দূরে পাঠিয়ে দেব... আমাদের রাজত্বে আর কারো ভাগ থাকবে না!”

চার্চের প্রতিটি কোণে তাদের সেই কুৎসিত কথাগুলো প্রতিধ্বনি হতে লাগল। মিডিয়ার ক্যামেরাগুলোর ফ্ল্যাশলাইট অনবরত লারা আর ফারহানের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের ওপর আছড়ে পড়তে শুরু করেছে।

ইসাবেলা আতঙ্কে বুক চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলেন, "লারা! ফারহান! তোরা... তোরা আমার সাথে এই বিশ্বাসঘাতকতা করতে চেয়েছিলি?!"

ফারহান ভয়ে আর আতঙ্কে চার্চের পেছনের দরজার দিকে দৌড়াতে গেল, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সাধারণ অতিথির ছদ্মবেশে থাকা অন্তত পনেরো জন ইন্টারপোল ও স্পেশাল স্কোয়াডের কভার্ট অফিসার রিভলভার উঁচিয়ে ফারহানকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল!

ঠিক তখনই—চার্চের দোতলার রাজকীয় বেলকনি সেকশন থেকে এক ধীর, বরফশীতল পদক্ষেপের শব্দ শোনা গেল।

সবাই একযোগে ওপরের দিকে তাকাল।

উঁচু বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে ইউভান ডিউক! পরনে নিখুঁত ব্ল্যাক থ্রি-পিস স্যুট, চোখে এক পৈশাচিক আভা আর ঠোঁটের কোণে মরণশীতল হাসি। তার হাতে একটা ছোট রিমোট কন্ট্রোল।

ইউভান ধীরপায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। তার প্রতিটি পদক্ষেপের আওয়াজে লারা আর ফারহানের  কাঁপছিল।

"তোমাদের কি সত্যি মনে হয়েছিল, লারা?" ইউভান বরফশীতল গলায় হেসে উঠল। "যে ডক্টর জেকবের বিষাক্ত ড্রাগস খাইয়ে তুমি আমাকে নিস্তেজ করে ফেলে রাখবে? ডক্টর জেকব তোমাদের টাকা নেওয়ার আগেই ডেভিডের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে! কাল রাতে   সেই বিষাক্ত খাবার আমি ছুঁয়েও দেখিনি।"

লারা ভয়ে দু-পা পিছিয়ে হাঁটু গেড়ে মেঝেই পড়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, "ইউ-ইউভি! প্লিজ! আমাকে ক্ষমা করো! ফারহান আমাকে উস্কানি দিয়েছিল! এমনকি রেহান তোমার ভাই , ইসাবেলা তোমার মেমরি লস এর সুযোগ নিয়েছে। ওরা তোমায় মারতে চেয়েছে। আমি তোমাকে ভালোবাসতাম!"

"ভালোবাসা?!" ইউভান লারার সামনে এসে এক হাঁটু ভেঙে বসল, তার চোখে তখন পরম ঘৃণা। "তুমি ভালোবেসেছিলে কেবল এই ডিউক বংশের টাকা আর ক্ষমতাকে! যার জন্য তুমি ও  ওদের সাথে যুক্ত ছিলে আমার মিহিরিমার ওপর হামলা করতে ! আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে আমার থেকে কেড়ে নিতে !"

ফারহান চিৎকার করে উঠল, "আংকেল! না! আমি কিছু জানি না! সব এই লারার কাজ!"

ইউভান উঠে দাঁড়িয়ে এক শীতল দৃষ্টি দিল ফারহানের দিকে। "তোদের দেওয়া  ড্রাগস খেয়ে বিগত দুই বছর ধরে আমি অন্ধকারের নাটক করেছি কেবল তোদের মতো কালসাপগুলোকে একই খাঁচায় বন্দি করার জন্য। আজ সেই নাটকের শেষ দৃশ্য।"

বিশেষ সিআইডি অফিসার এগিয়ে এসে ফারহানের হাতে এক ঝটকায় ভারী লোহার হাতকড়া পরিয়ে দিল।

অফিসার গম্ভীর গলায় বললেন, "লারা ক্লার্ক এবং ফারহান ডিউক সহ মিসেস ইসাবেলা, রেহান ডিউক কে আমরা ! মানি লন্ডারিং, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি জালিয়াতি, খুনের চেষ্টা এবং ইউভান ডিউককে স্লো পয়জনিং করার অপরাধে আপনাদের অফিশিয়ালি অ্যারেস্ট করা হচ্ছে।"

লারা যখন বুঝল যে তার সব চক্রান্ত শেষ হতে চলেছে এবং পুলিশ তাদের ঘিরে ফেলেছে, তখন সে শেষবারের মতো হিংস্র পশুর মতো অন্ধ আক্রোশে ক্ষেপে উঠল।

তার ওয়েডিং গাউনের গোপন পকেটে লুকানো ছিল সেই ড্রাগসের একটা ছোট ইমার্জেন্সি সিরিঞ্জ—যা তার সবসময় থাকে।

পুলিশের হাত থেকে নিজেকে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে লারা  ইউভানের দিকে পাগলের মতো ধেয়ে গেল।

"যদি আমি তোমার সম্পত্তি না পাই, তবে তোমাকে ও আমি বেঁচে থাকতে দেব না, ইউভান!" লারা উন্মাদের মতো গর্জে উঠল।

অফিসাররা কিছু বুঝে ওঠার আগেই লারা তার হাতের সূক্ষ্ম বিষাক্ত সিরিঞ্জটা ইউভানের ঘাড়ের এক পাশে সজোরে বিধিয়ে দিয়ে পিস্টনটা চেপে ধরল!

"বস!" ডেভিড চিৎকার করে ছুটে এলো।

ইউভান চমকে উঠে লারাকে এক প্রচণ্ড ধাক্কায় দূরে সরিয়ে দিল, কিন্তু ততক্ষণে সিরিঞ্জের কড়া সাইকোট্রপিক ড্রাগসের পুরো তরলটা তার ঘাড়ের রগ বেয়ে সরাসরি রক্তে মিশে গেছে।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ইউভানের মাথাটা ঘুরে উঠল। চারপাশের চার্চের দৃশ্য, পুলিশের চিৎকার আর ক্রিস্টাল লাইটগুলো যেন এক অদ্ভুত ধোঁয়াটে কুয়াশায় ঢেকে যেতে লাগল।

তার চোখের সামনে মিহিরিমা আর ছোট্ট আয়রার ছবিটা আবছা হয়ে আসতে লাগল...

ইউভান মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে ধসে পড়ল। তার চোখের সামনে শেষ দৃশ্য ভেসে উঠল—অফিসাররা লারাকে মেঝেই ফেলে হাতকড়া পরাচ্ছে, আর ডেভিড ক তার দিকে দৌড়ে আসছে...

সব আলো যেন এক নিমেষে চিরতরে নিভে গেল। ইউভান জ্ঞান হারিয়ে  মেঝের ওপর ঢলে পড়ল।

এক মাস কেটে গেছে। নিউজিল্যান্ডের শান্ত, নির্জন লেকসাইড ভিলায় মিহিরিমার দিনগুলো কাটছিল গভীর এক অনিশ্চয়তা আর নীরব যন্ত্রণায়। ইউভান যে তার খোঁজ পেয়ে গেছে বা চার্চে কী ভয়ঙ্কর তাণ্ডব ঘটে গেছে—তার কিছুই মিহিরিমার জানা ছিল না।

মিহিরিমার মানসিক অবস্থা বুঝে  ডক্টর জেকব তার ওপর নজর রাখছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি অন্য মোড় নিতে শুরু করল।

লেক ওয়াকাটিপুরের পাড়ে এক বিকেলে মিহিরিমা একা বসে ছিল। ছোট্ট আয়রা পাশে সবুজ ঘাসে খেলা করছিল।

জেকব ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মিহিরিমার পাশে দাঁড়ালেন। তার হাতে একটা ট্যাবলেট আর কিছু ভুয়া নিউজ পেপারের কাটিং।

"মিহিরিমা..." জেকব খুব শান্ত গলায় ডাকলেন।

মিহিরিমা মুখ তুলে তাকাল। তার চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ, মুখটা বিষাদে ফ্যাকাশে। " জেকব... আমি ঠিক আছি! প্লীজ আমি একটু একা থাকতে চাই"

জেকব এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা মিথ্যা খবরের কাগজ মিহিরিমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

কাগজের প্রথম পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা—“ডিউক ম্যানশনের গ্র্যান্ড ওয়েডিং: লারা ক্লার্কের সাথে ইউভান ডিউকের রাজকীয় বিবাহ সম্পন্ন।” সাথে ইউভানের স্যুটিং পরা বরের পোশাকের একটা অস্পষ্ট ছবি (যা আসলে ইউভানের সেই সিকিউরিটি এজেন্টের ছিল)।

ছবিটা দেখেই মিহিরিমার বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ করে উঠল। তার হাত থেকে কাগজটা খসে পড়ল ঘাসের ওপর। চোখের কোণ বেয়ে অবাধ্য জলের ধারা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।

"ইউভান... লারাকে বিয়ে করে নিয়েছে?" মিহিরিমার গলা ধরে এলো।

"হ্যাঁ, মিহিরিমা," জেকব অত্যন্ত দরদী অভিনয় করে বললেন। "ইউভান এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছে। লারা আর ডিউক পরিবারের ট্রাস্ট নিয়ে সে ব্যস্ত। সে জানে তুমি আর বেঁচে নেই... কিংবা সে তোমাকে ভুলে গেছে।"

মিহিরিমা দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার বুকের ভেতর টা যেনো কেউ ছুরি দিয়ে আঘাত করছে।

জেকব মিহিরিমার কাঁধে সাবধানে হাত রেখে নিচু গলায় বললেন, "আর কতকাল অতীত আঁকড়ে নিজেকে শেষ করবে, মিহিরিমা? ওই লোকটা তার নিজের জীবনে এগিয়ে গেছে। তোমারও তো একটা জীবন আছে, আয়রার একটা ভবিষ্যৎ আছে। তুমি কেন অতীত ভুলে নতুন করে শুরু করছ না?"

মিহিরিমা চোখের জল মুছে জেকবের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল।

জেকব খুব কোমল গলায় প্রস্তাবটা দিলেন, "আমি জানি আমি তোমার অতীত মুছতে পারব না। কিন্তু আমি তোমাকে আর আয়রাকে একটা নিরাপদ ভবিষ্যৎ দিতে চাই। যদি তোমার আপত্তি না থাকে... তুমি কি আমাকে বিয়ে করে একটা নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ দেবে? আমি আয়রাকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রাখব।"

মিহিরিমা স্তম্ভিত হয়ে  জেকবের দিকে তাকিয়ে রইল। চারপাশের বরফশীতল হাওয়া যেন তার বুকে এসে বিঁধছিল।

সে কি সত্যিই এবার ইউভানকে ভুলে গিয়ে অন্য কারো হাত ধরবে?

চলবে?

কেমন লাগলো অবশ্যই জানাবেন।

Write a comment ...

Write a comment ...

story universe ( স্নেহার ডায়রি)

Pro
A proud pratilipi bengali writer