ইউভানের স্টাডি রুমের বাতাস যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে বরফ হয়ে গেল। বিষাক্ত আক্রোশ, অপরাধবোধ আর চরম প্রতিশোধের এক ভয়ঙ্কর মিশেল ফুটে উঠেছে ইউভানের দু-চোখে। চুরমার হয়ে যাওয়া ক্রিস্টাল গ্লাসের টুকরোগুলো স্টাডি রুমের মেঝেময় ছড়িয়ে আছে।
ইউভান আর এক মুহূর্তও নষ্ট করতে চায়নি। বিয়ের সেই দশ দিনের নাটকের জন্য অপেক্ষা করা তো দূরের কথা, নিজের সন্তান আর স্ত্রীকে যে নরকের মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, তার এক একটি হিসাব এখন সে আদায় করবে এক অনমনীয় হিংস্রতায়।
রাত তখন আনুমানিক দুটো। রেহান তার আলিশান ক্লাবের প্রাইভেট লাউঞ্জে বসে হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল। ১০ লাখ ডলারের সেই চেক ক্যাশ হয়ে যাওয়ার পর সে নিজেকে ডিউক পরিবারের আসল উত্তরাধিকারী ভাবছিল। হাজার হোক, একই মা এর রক্ত তার গায়েও বইছে, যদিও সে সৎ ভাই! ঠিক তখনই লাউঞ্জের ভারী কাঠের দরজাটা এক প্রচণ্ড লাথিতে ভেঙে দু-ফাঁক হয়ে গেল।
ভেতরে ঢুকলো ইউভান। তার পরনে লং ওভারকোট, চোখে এক হিমশীতল শূন্যতা। পেছনে ডেভিড আর চারজন সশস্ত্র বডিগার্ড।
রেহান চমকে উঠে দাঁড়াল, "ইউভি? তুমি এই রাতে এখানে? কোনো প্রবলেম—"
কথা শেষ করার আগেই ইউভান এক পায়ে এগিয়ে এসে রেহানের গলার কলার চেপে ধরল। ভারী এক ধাক্কায় তাকে কাঁচের টেবিলটার ওপর আছড়ে ফেলল। মদের গ্লাস আর বোতল চুরমার হয়ে রেহানের পিঠে আর মুখে বিধে গেল। রেহান আর্দ্র আর্তনাদ করে উঠল, "ইউভান! মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার? আমি তোমার ভাই!"
"সৎ ভাই!" ইউভান তার বরফশীতল গলায় ফিসফিস করে উঠল। সে রেহানের চুলে মুঠি ধরে টেনে তার মুখটা ওপরে তুলল। "যে ভাই ডিউক ট্রাস্টের কোটি কোটি টাকা শাটডাউন কোম্পানির নামে মানি লন্ডারিং করে নিজের অ্যাকাউন্টে পাঠায়? যে ভাই আমার স্ত্রী কে হাত করে আমার পিঠেই ছুরি বসিয়েছিল পাঁচ বছর আগে সেই ভাই?"
রেহানের চোখের মণি আতঙ্কে কাঁপতে লাগল। সে তো জানে ইউভানের স্মৃতি হারিয়ে গেছে! এমনকি ইউভান এর মেমরি আসার তো কথা নয়।
ইউভান ডেভিডের দিকে ইশারা করতেই ডেভিড এক গোছা লিগ্যাল পেপারস আর অ্যাকাউন্টের নথি রেহানের মুখের ওপর ছুঁড়ে মারল।
"রেহান ডিউক," ইউভানের কণ্ঠস্বর যেন এক মৃত্যুর পরোয়ানা। "পরশু সকালের মধ্যে তোর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হচ্ছে। সৎ ভাই হয়েও যে জালিয়াতি আর বিশ্বাসঘাতকতা করেছিস, তার আটটা নন-বেলেবল ওয়ারেন্ট অলরেডি রেডি। ডিউক পরিবার থেকে তোর নাম চিরতরে মুছে ফেলা হলো। তবে তার আগে..."
ইউভান রেহানের হাতের যে আঙুলগুলো দিয়ে ডেভিডের কাছে চেক নেওয়ার সাইন হয়েছিল, সেই ডান হাতটা ধরে এক ঝটকায় টেবিলের কোণায় রেখে সজোরে নিজের বুট জুতো দিয়ে পিষে দিল।
রেহানের হাড় মচকে যাওয়ার এক বিকট শব্দের সাথে সাথে পুরো লাউঞ্জ তার গগনবিদারি চিৎকারে কেঁপে উঠল।
ইউভান পকেট থেকে রুমাল বের করে হাত মুছতে মুছতে বরফশীতল গলায় বলল, "ভাই হিসেবে তোকে এতদিন মাথায় তুলে রেখেছিলাম, রেহান। এবার জেলের অন্ধ কুঠুরিতে পচে পচে মরবি তুই।"
রেহানকে থাপ্পড় মেরে কাঁচের টেবিলটার ওপর ফেলে দেওয়ার পরও ইউভানের ভেতরের সেই পৈশাচিক আক্রোশ বিন্দুমাত্র কমেনি। নিজের রক্তের সৎ ভাই হয়েও পাঁচ বছর আগে থেকে করতে থাকা প্রত্যেক টা ষড়যন্ত্র প্রত্যেক টা ধোঁকা , তার স্ত্রী তার মিহিরিমার আজ এই পরিস্থিতি!!তার জন্য কোনো সাধারণ শাস্তি যথেষ্ট হতে পারে না।
"ওকে বাঁধো," ইউভানের কন্ঠস্বর পুরো লাউঞ্জে বরফের মতো জমে গেল।
ডেভিড আর তার সঙ্গীরা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই রেহানকে হাত-পা বেঁধে লাউঞ্জের ভেতরের গোপন সাউন্ডপ্রুফ ব্লেড-রুমে টেনে নিয়ে গেল। রাত দুটো থেকে শুরু হলো সেই নারকীয় তাণ্ডব। পুরোটা রাত ধরে ইউভান নিজের হাতে রেহানকে চাবুক, ফুটন্ত গরম জল আর লোহার রড দিয়ে একের পর এক টর্চার করে গেল।
রেহান নিজের সৎ ভাইয়ের কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে অনবরত চিৎকার করছিল। "ইউভি... ছেড়ে দে আমাকে... আর হবে না... বাঁচা আমাকে!" কিন্তু তার চিৎকার সাউন্ডপ্রুফ দেয়াল টপকে বাইরে পৌঁছাতে পারেনি। ভোরের আলো ফোটার আগে আগেই, একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে আর বিষাক্ত কেমিক্যাল গলায় ঢেলে দেওয়ার কারণে রেহানের ভোকাল কর্ড পুরোপুরি ছিঁড়ে চুরমার হয়ে গেল। তার স্বরযন্ত্র চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেল—সে তার গলার আওয়াজ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলল। রেহান এখন স্রেফ একটা জীবন্ত লাশ, যে আর কোনোদিন কোনো কথা বলতে পারবে না, কারো সামনে মুখ খুলতে পারবে না।
ভোরবেলা রক্তাক্ত, আধমরা এবং বোবা রেহানকে শহরের এক গোপন প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে ইউভান ম্যানশনে ফিরে এলো। নিজেকে ঝকঝকে স্যুট-বুটে পরিপাটি করে সাজিয়ে সে যখন সকালের ব্রেকফাস্ট টেবিলে গিয়ে বসল, তখন তার মুখে এক ফোঁটাও হিংস্রতার ছাপ নেই রাতের।
ডাইনিং টেবিলে তখন ইসাবেলা আর লারা বসে কফি খাচ্ছিল। ইউভান চিন্তিত ও বিষণ্ণ মুখ করে লারার পাশে গিয়ে বসল।
"ইউভি? কী হয়েছে তোমার? তোমাকে এত চিন্তিত লাগছে কেন?" লারা আলতো করে ইউভানের হাত ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করল।
ইউভান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব নিখুঁত এক দুশ্চিন্তার ফুটিয়ে তুলল তার চেহারায়। "কী বলব বলো... কাল রাত থেকে রেহানের কোনো খবর পাচ্ছি না। ও তো রাতে ক্লাবে গিয়েছিল, তারপর থেকে ওর ফোন সুইচ অফ। সকালে শুনলাম কোনো এক অজানা গ্যাং নাকি ওর ওপর অ্যাটাক করেছে! ও এখন হাসপাতালে ভর্তি... আর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, ডক্টররা বলছেন রেহান নাকি আর কোনোদিন কথা বলতে পারবে না! ওর গলার আওয়াজ চিরতরে চলে গেছে!"
কথাটা শুনে ইসাবেলা চমকে উঠলেন, " কি হয়েছে আমার রেহান এর। জেসাস ক্রিস্ট! ইউভি প্লীজ বলো আমায় সে ভালো আছে কিনা!
লারাও ভেতরের আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে গেল, কিন্তু মুখে কান্নার ভান করে বলল, "ও মাই গড! রেহানের সাথে এমনটা কে করল? ইউভি, তুমি প্লিজ পুলিশকে বলো ওদের খুঁজে বের করতে!"
ইউভান লারার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক চরম পৈশাচিক আনন্দ পেল। সে লারার পিঠে আলতো করে হাত রেখে খুব দরদী গলায় বলল, "চিন্তা কোরো না লারা... যে-ই আমার ভাইয়ের এই অবস্থা করে থাকুক না কেন, আমি তাকে ছাড়ব না। বিয়ের আগেই এমন একটা বিপর্যয় ঘটবে, ভাবতেই পারছি না।"
ইসাবেলা কেঁপে উঠে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। চোখে জল, ঠোঁট কাঁপছে, "আমার হান... ইউভি, আমাকে এখনই হাসপাতালে নিয়ে চলো! ও কথা বলতে পারছে না মানে কী? কী করেছে ওই গ্যাংস্টারগুলো ওর সাথে?!"
"শান্ত হও, ইসা," ইউভান গলার স্বর নরম করে ইসাবেলার হাত ধরল। "আমি সব সিকিউরিটি বাড়িয়ে দিয়েছি। হাসপাতালে ডেভিড আর আমাদের সেরা বেস্ট টিম মোতায়েন আছে। তুমি এই অবস্থায় ভেঙে পড়লে লারা আর ম্যানশন কে সামলাবে? ডাক্তাররা টেস্ট করছেন, আমি নিজে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে এসেছি।"
লারা ভয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, "ইউ-ইউভি... আমাদের বিয়ের আর মাত্র ক'টা দিন বাকি। এখন এসব কী হচ্ছে? আমার খুব ভয় করছে!"
ইউভান ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময়, হিমশীতল হাসি ফুটিয়ে লারার কাঁধে হাত বুলাল। "ভয় কিসের, লারা? আমি তো আছি। আমি থাকতে তোমার কোনো ক্ষতি হতে দেব না। তুমি শুধু বিয়ের প্রস্তুতিতে ফোকাস করো... বিয়ের দিন যা সারপ্রাইজ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে, তা তুমি সারাজীবন মনে রাখবে।"
চলবে?
Write a comment ...