72

Farhan is coming

মারিয়া প্রায় দৌড়ে করিডোরে বেরিয়ে এলো।

তার শ্বাস অস্বাভাবিক দ্রুত। মুখে আবার মাস্ক পরে নিলেও কাঁপতে থাকা হাত দুটো লুকাতে পারল না।

ঠিক তখনই করিডোরের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ডেভিডের সঙ্গে তার চোখাচোখি হয়ে গেল।

ডেভিড একবার মারিয়ার দিকে তাকাল, তারপর ধীরে ইউভানের রুমের আধখোলা দরজার দিকে।

ভেজা চুলে, নির্লিপ্ত মুখে ইউভান ডেভিড কে দেখেও হটকারী হলো না। ডেভিডের বহু বছরের অভিজ্ঞতা বলছিল—কিছু একটা বদলেছে।

"Boss."

ডেভিড দরজা বন্ধ করে সামনে দাঁড়াল।

"ইয়েস ডেভিড।"

"আপনি কি ওই নতুন কেয়ারটেকারকে আগে কোথাও দেখেছেন?"

ইউভান ল্যাপটপ বন্ধ করে ধীরে তার দিকে তাকাল।

"না।"

"তাহলে...?"

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।অবশেষে ইউভান গভীর শ্বাস ফেলল।

"আমি জানি না কেন।"

"মানে?"

"মেয়েটাকে দেখলেই অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়।"

ডেভিডের চোখ সরু হয়ে গেল।

"আপনার কি... কিছু মনে পড়ছে?"

এই প্রশ্নে ইউভান দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর মাথা নাড়ল।

"না। কোনো স্মৃতি না।"

সে জানালার বাইরে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

"শুধু... একটা অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করি। এর বেশি কিছু নয়।"ডেভিড আর কোনো কথা বলল না।কিন্তু তার বুকের ভেতর অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল।যদি ইউভানের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ধীরে ধীরে ফিরে আসতে শুরু করে? ডাক্তার বলেছিল এটা সম্ভব কিন্তু তার জন্য তাকে পুরোনো কথা গুলো মনে করাতে হবে। কিন্তু এই বিভীষিকায় ইউভান কে কখনও সুস্থ হতে দেবে না। তাকেও বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে এই জন্যই।  কিন্তু সে কিছুতেই তাদের কে সফল হতে দেবে না। কখনোই না!

_______________

মারিয়া সেদিন এর পর থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।   গ্র্যণীর কাজ করে নিজের রুমে ফিরে আসে সে। আর একটা বিষয় খেয়াল করেছে বাকি স্টাফ রা তাকে দেখলেই কেমন ফিসফিস করছে। মারিয়ার ভেতর টা আড়ষ্ট হয়ে আসছে। সেদিন এর ঘটনায় কেনো নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিল সে? এত ঠুনকো হয়ে গেল তার মনোবল! কেনো এমন হচ্ছে তার সাথে!

" ইউভান স্যার রুমে সেদিন এই ছিল। আমি দেখেছিলাম "

" হ্যা লারা ম্যাম জানলে মেয়েটা কে কি যে করবে!"

"লারা ম্যাম প্রচণ্ড পজিসিভ!"

মারিয়া জামার এপ্রোন টা শক্ত করে চেপে ধরল। রান্নাঘরে এসেছিল সে স্যুপ বানাতে! সেদিন তার উপস্থিতি অনেকেই দেখেছে । লারা বাইরে থাকা অবস্থা তেই ইউভান তার সাথে..  ভাবতেই গাল গুলো গরম হয়ে এলো তার। কিন্তু পরক্ষণেই গা গুলিয়ে এলো তার। ইউভান নিজের হবু স্ত্রীর উপস্থিতিতে একজন স্টাফ এর সাথে এমন টা কি করে করতে পারে! ইউভান তো কখনওই এমন ছিল না!

চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

" নজর সাবধানে। একটু এদিক ওদিক হলে তুমি নাও থাকতে পারো পৃথিবীতে! "  মারিয়া মেয়েলি কণ্ঠে চমকে উঠল। তখনই নাকে পুড়ে যাওয়ার গন্ধ আসতেই গ্যাস এর দিকে তাকাল সে কিন্তু ততক্ষণে রোজী তা বন্ধ করে দিয়েছে।

" রোজি?"

" ইয়েস! আমি জানি তুমি স্যার রুমে ছিলে সেদিন । "

মারিয়া ভয় পেল । গলা শুকিয়ে এলো তার।

" রোজি আমি.."

" শশশ! নেক্সট বার যাওয়ার সময় সাবধানে যাবে!"

রোজির কথায় চমকে উঠল মারিয়া।

" রোজি তুমি ভুল ভাবছো। স্যার এর বিয়ে ঠিক হয়ে রয়েছে। ওনার হবু স্ত্রী লারা ম্যাম.."

" মাই ফুট!"

রোজি মুখে এক দলা থুতু পাকিয়ে বলল।

" অনেক লম্বা কাহিনী। পরে একদিন বলবো জাস্ট এটা বলবো। ইউভান স্যার কখনোই ওই স্লাট কে বিয়ে করতে চায় নি। যদি না মিসেস আলেকজেন্দ্রীর লাস্ট উইশ  মানতে হতো। বাই ওই রাক্ষসী টা পুরো ম্যানশন এ নিজের খবরী লাগিয়ে রেখেছে। বেশি ক্ষণ থাকলে সন্দেহ বাড়বে! "

রোজি চলে যেতেই মারিয়ার হৃদয় এ অদ্ভুত রকম অনুভব হলো। এটা কি তবে সত্যি? কি এমন কাহিনী হয়েছে এই পাঁচ বছরে যা দুনিয়ার কাছে পৌঁছায় নি কখনও!

মারিয়া লক্ষ্য করল সব মিলিয়ে দশ টার ও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে যেনো সব কিছু উপর মহল থেকে কন্ট্রোল করছে কেউ। কেনো? পাঁচ বছর আগের ইউভান হলে কখনোই এমন কিছু সহ্য করত না তার বাড়িতে। কিন্তু এখন যেনো সবটা  ধরা ছোঁয়ার বাইরে লাগে তার।

_______________________________

ইউভানকে একটি চ্যারিটি প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে তার স্ট্রাস্টির বোর্ডিং স্কুলে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।ডেভিডও সঙ্গে ছিল।

স্কুলে ঘুরে দেখার সময় হঠাৎ ছোট্ট একটি মেয়ে দৌড়ে এসে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে খেলতে ইউভানের সামনে থেমে গেল। ইউভান তাকে আগেও একবার দেখেছে । এক দম পুতুল এর মতো দেখতে। ইউভান এর ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠল

আয়রা।তার হাতে রঙতুলি।

সে নির্ভয়ে বলল,

"Mr prince, তুমি আবার এসেছো? আমার ছবিটা দেখবে?"

ইউভান অজান্তেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

"অবশ্যই।"

আয়রা ছবিটা এগিয়ে দিল।

ছবিতে ছিল একটা বাড়ি, একটা বড় গাছ আর তিনজন মানুষ—একজন মা, একজন ছোট মেয়ে, আর একজন বাবার মতো দেখতে ছায়ামূর্তি।

"খুব সুন্দর এঁকেছ।"

ইউভানের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।  সে আয়ারার হাত ধরে মাঠের মাঝে একটি গাছের তলায় গিয়ে বসল। তার লোকেদের। বাচ্চাদের সমস্ত খাবার, পুতুল আনার ব্যবস্থা করল।

ডেভিড দূর থেকে সব দেখছিল।

অদ্ভুত ব্যাপার...

যে মানুষটা সাধারণত শিশুদের সঙ্গে সময় কাটায় না, সে প্রায় আধঘণ্টা ধরে আয়রার সঙ্গে গল্প করছে।

আর আয়রাও যেন তাকে বহুদিনের পরিচিত মনে করে কথা বলছে।ডেভিডের বুকের ভেতর অদ্ভুত শান্তি বিরাজ করল অন্তত ইউভান কোথাও তো শান্তি খুঁজে পেয়েছে!

হঠাৎই তার ফোন টা বেজে উঠল। ফোন টা কানে তুলতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো নিমিষে!

" ওই মেয়েটা কে ইউভান এর সাথে? কিসের এত তলব ওসব  ভিকারী দের সাথে তার! তোকে কি জন্য রাখা হয়েছে হ্যা? "

" রোহান স্যার, তেমন কিছু চিন্তার কারণ নেই। মেয়েটি সেফ। ইউভান স্যার জাস্ট কথা বলছেন !"

" শোন ভালো করে। ও যাতে কোনো গরীব বাচ্চা কে বাড়ি না নিয়ে আসে। আনলেও খতম করে দিবি তাকে!

রোহান এর ঘড়ঘড় কন্ঠ টা বন্ধ হতেই ফোন নামিয়ে নিল সে।  ডেভিড এর রাগে শিরা বেরিয়ে এসেছে কপালের। আর কতদিন এমনটা চলবে? কতদিন?

___________________________________________

এদিকে Duke Mansion এ খুশির আমেজ। ইসাবেলা পুরো ম্যানশন ফুল দিয়ে সাজিয়েছে। হবে নাই বা কেনো তার একমাত্র ছেলে ফারহান এত বছর পর বাড়ি ফিরছে!  কিন্তু অন্যদিকে লারা নিজের ঘরে পায়চারি করছে। তার মুখ মণ্ডলে হাসি নেই।তার মনে বারবার একই দৃশ্য ঘুরছে। সিসিটিভির ফুটেজ টি। যেখানে সে শপিং এ বেরিয়ে যাওয়ার পর ইউভান এর রুম থেকে একটি মেয়ে বেরিয়ে । কে মেয়েটি? মুখ স্পষ্ট নেই।

আর ইউভানের সেদিন এর আচরণ।

"না..."

লারা দাঁত চেপে বলল,

"কিছু একটা হয়েছে।"

রাগে সে পুরো ম্যানশনের স্টাফদের ডেকে পাঠাল।

"আজ থেকে কোন স্টাফ কোথায় যাচ্ছে! কি করছে সব খবর আমার লাগবে! তবে ওই মাস্ক পড়া মেয়েটি..."

"ও কোথায় যায়, কার সঙ্গে কথা বলে, কী করে—সব রিপোর্ট আমার টেবিলে চাই।"  লারার খুব কাছের স্টাফ কে এই নির্দেশ  দিল সে।

পুরো Duke Mansion-এ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। মারিয়া নীরবে দাঁড়িয়ে রইল সবটা তার কানে এলো চুপ করে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

ম্যানশনের বিশাল দরজার সামনে একের পর এক কালো গাড়ি এসে থামল।

সব স্টাফ সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে।

ইসাবেলার মুখে বহুদিন পর সত্যিকারের হাসি।

গাড়ির দরজা খুলতেই লম্বা, সুদর্শন এক যুবক নেমে এল। কালো স্যুট, চোখে সানগ্লাস, ঠোঁটে আত্মবিশ্বাসী হাসি।

ফারহান ডিউক।

"Welcome home, young master!"

সবাই একসঙ্গে মাথা নত করল।

ইসাবেলা ছেলেকে জড়িয়ে ধরল।

"অবশেষে ফিরে এলি!"

ফারহান হেসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

"দুবাইয়ের কাজ শেষ। এবার অনেকদিন লন্ডনেই থাকব।"

রেহানও এগিয়ে এসে ছেলের কাঁধে হাত রাখল।

"এবার পারিবারিক ব্যবসায় পুরোপুরি যোগ দেওয়ার সময় হয়েছে।"

ফারহান মাথা নাড়ল।

কিন্তু তার চোখ ইতিমধ্যেই আশেপাশের সবাইকে পর্যবেক্ষণ করছে। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি মারিয়ার ওপর গিয়ে আটকে যায়। মুখে মাস্ক? ইন্টারেস্টিং তো।

লারা বিষয় টা লক্ষ করে কুটিল হাসল। সে বলল, মারিয়া তুমি ফারহান এর দেখভাল করবে এখন থেকে। যাও রুমে  ব্যাগ গুলো পৌঁছে দিয়ে এসো।

মারিয়া মাথা নত করল। ফারহান তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট দিয়ে জিভ ভিজিয়ে নিল।

" I need rest. I want to go my room"

বলেই ফারহান তার রুমের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

মারিয়া যত দ্রুত তার কাজ শেষ করছিল হঠাৎ কারোর পদশব্দ শুনে সে চমকে উঠল।ফারহান কে তার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মারিয়া ঘাবড়ে গিয়ে বলল, সরি স্যার। আমি পড়ে আসছি!

বলেই বেরিয়ে যেতে নিলে ফারহান তার কব্জি টেনে ধরল।

" এত তাড়াহুড়ো কিসের ডার্লিং।! " ফারহান এর কুটিল হাসি

দেখেই মারিয়ার গা গুলিয়ে উঠল। ফারহান কে নিজের অত্যধিক কাছে দেখে তার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে এলো।

" Let's have some fun in my bed"

চলবে?

Write a comment ...

Write a comment ...