সূর্যের আলোর ছটাতে ভোরের আকাশ ঝলমল করছে তখন। সারা রাত একটা মুহূর্ত মারিয়া নিজের চোখের পাতা এক করতে পারে নি তার।
ক্যাব এ জানালার বাইরে শহরটা দ্রুত পিছিয়ে যেতে দেখলেও , মারিয়ার বুকের ভেতরের ঝড়টা কিছুতেই থামছে না। চোখের কোণে জমে থাকা জল বারবার ঝাপসা করে দিচ্ছে তার দৃষ্টি
ইউভান বেঁচে আছে।
এই একটা সত্যিই যেন তার পুরো পৃথিবীটা আবার ওলটপালট করে দিয়েছে।পাঁচ বছর…
পুরো পাঁচটা বছর সে বিশ্বাস করেছে মানুষটা মারা গেছে। সেই বিশ্বাস নিয়েই নিজের পুরোনো পরিচয় কবর দিয়েছে। নিজের মুখ বদলেছে। নিজের সন্তানকে লুকিয়ে বড় করেছে।আর আজইউভান দিব্যি বেঁচে আছে। অন্য একজন নারীর আঙুলে engagement ring পরিয়ে নতুন জীবন শুরু করছে। মারিয়ার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। সব টা কেমন দুঃস্বপ্নের মতো লাগছে তার। সে কিছুতেই ওই ম্যানশন এ ফিরে যাবে না। কখনওই না। এসব ভাবনার মাঝেই ক্যাব টি এসে থামল আয়রার Boarding School এর সামনে ।মুহূর্তেই তার মুখ নরম হয়ে গেল। গাড়ি থেকে নেমে বিশাল বড়ো গেট পার হতেই একজন সিস্টার এর সাথে আয়রার কে এগিয়ে আসতে দেখে মারিয়ার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
“মাম্মা!”
আয়রা এসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মারিয়াকে।
মুহূর্তেই মারিয়ার চোখ ভিজে উঠল।সে হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েটার মুখ দুহাতে ধরে রাখল।
এই ছোট্ট মেয়েটাই তো তার বেঁচে থাকার কারণ।
যে কারণে সে এতগুলো বছর যুদ্ধ করেছে।
“তুমি কাঁদছো কেন?”
আয়রা ছোট্ট হাত দিয়ে তার চোখ মুছিয়ে দিল।
মারিয়া জোর করে হাসল।
“Nothing baby… Mama missed you.”
আয়রা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“You promised you won’t cry anymore.”
এই কথাটাতেই মারিয়ার বুকটা হুহু করে উঠল।
কারণ সে জানে তার জীবন আবার ও সেই অন্ধকারের দিকে ফিরে যাচ্ছে। কেনো লন্ডনে আসল সে! জেকব ঠিক বলেছিল তাকে। কিন্তু ভাবে নি এত তাড়াতাড়ি তার মুখের কথা ফলবে! কিন্তু জেকব এখনও জানে না ইউভান জীবিত ও জানলে কখনোই তাকে এখানে কাজ করতে দেবে না!
আয়রার সাথে বেশ খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে,
আয়রাকে ঘুম পাড়িয়ে boarding-এর guest room-এর balcony-তে দাঁড়িয়ে ছিল মারিয়া।
তার হাত কাঁপছে। তবুওফোনটা শক্ত করে ধরে অবশেষে সে Duke Mansion-এর number dial করল।কয়েকবার ring হওয়ার পর call receive হলো।
“Duke Mansion.”
মারিয়া ঠান্ডা গলায় বলল,
“I’m Maria Clark. আমি আর কাজ করবো না।”
ওপাশ কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল।
তারপর professional গলায় উত্তর এলো,
“I’m sorry ma’am, সেটা সম্ভব নয়।”
মারিয়ার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“What do you mean?”
“আপনি one-year contractual agreement-এ sign করেছেন, Miss Clark. Contract break করলে আপনাকে heavy compensation pay করতে হবে।”
মুহূর্তেই মারিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
তার এখন এত টাকা নেই।একেবারেই নেই।
ওপাশ থেকে আবার গলা ভেসে এলো,
“ মিসেস আলেকজেন্দ্রীর শরীর ভালো নয়। আপনাকে শীঘ্রই এখানে আসতে হবে। নয়তো ইসাবেলা ম্যাম খুব রেগে যাবেন!
এই কথাটাতেই মারিয়ার বুক ধক করে উঠল। ইসাবেলা! রেহান এর স্ত্রী?
আর গ্র্যানি…চোখ বন্ধ করল সে।
এই মানুষটার জন্যই তো দোটানা হয়ে আছে সে।
কিন্তু এখন?এখন একই ছাদের নিচে ইউভানের সাথে থাকা সম্ভব?অসম্ভব।ধীরে ফোনটা কেটে দিল মারিয়া।তারপর মাথা নিচু করে নিঃশব্দে কেঁদে ফেলল সে নিঃশব্দে! সে নিরুপায়। তাকে এখানে না চাইলেও কাজ করতে হবে। অত টাকা তার নেই ভর্তুকি দেওয়ার মতো!
আয়রাকে বিদায় জানিয়ে মারিয়া ফিরে আসে তার রেন্ট এর বাড়িতে।আজ ই তাকে নিজের সব জিনিসপত্র নিয়ে permanently Duke Mansion-এ shift হতে হবে।
দরজা খুলতেই ভেতর থেকে পরিচিত গলা ভেসে এলো—
“Maria?”
মুহূর্তেই সে থমকে গেল।Jacob! এখনও যায় নি সে এখান থেকে! এই মানুষটার জন্য কৃতজ্ঞ সে। জেকব না থাকলে হয় মিহিরিমা মারিয়া হয়ে উঠতো না।
ধূসর hoodie পরে kitchen-এর পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে।চোখেমুখে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ।
মারিয়াকে দেখেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“You look terrible.”
মারিয়া দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“আমি ঠিক আছি।”কিন্তু তার কণ্ঠের কাঁপুনি লুকাতে পারল না।Jacob ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।
“Don’t lie to me.”
মারিয়ার বুক ধক করে উঠল।কারণ পৃথিবীতে যদি কেউ তাকে সবচেয়ে ভালো বুঝে থাকে
তাহলে সেটা হয়তো Jacob।
এই মানুষটাই গত পাঁচ বছর তাকে আর আয়রাকে আগলে রেখেছে।যখন পুরো পৃথিবী তাকে মৃত ভেবেছিল, তখন Jacob-ই তার পাশে দাঁড়িয়েছিল।
“Something happened?”
নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল জেকব!
মুহূর্তেই গত রাতের দৃশ্যটা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠল—
ইউভানের গরম নিঃশ্বাস একদম তার কাছে । তার কর্কশ কণ্ঠ—
“Who are you…?”
মারিয়ার বুক মোচড় দিয়ে উঠল।না।
সে কিছুতেই Jacob-কে সত্যিটা বলতে পারবে না।
কারণ Jacob জানলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে এখান থেকে নিয়ে চলে যাবে।
নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল,
“Nothing happened.”
জেকব ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইল। স্পষ্ট — সে বিশ্বাস করেনি। সে খুব ভালো করে চেনে মাটিতে কে। মারিয়া তাড়াতাড়ি suitcase খুলে কাপড় গুছাতে শুরু করল।
“আমাকে আজই shift করতে হবে।”
“What?”
Jacob বিস্মিত চোখে তাকাল।
“You’re moving there permanently?”
মারিয়া ধীরে মাথা নাড়ল।
“Where exactly?” জেকব জানে না কোথায় ঠিক মারিয়া কাজ পেয়েছে! এই প্রশ্নে মারিয়ার মুহূর্তেই বুক কেঁপে উঠল।
মারিয়ার মুহূর্তেই তার বুক কেঁপে উঠল।না। সে কিছুতেই বলতে পারবে না যে সে Duke Mansion-এ যাচ্ছে।
তাই মুখ ঘুরিয়ে ধীরে বলল,
“একটা private estate-এ… old lady-র caretaker হিসেবে।”
Jacob কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
“Live-in job?”
“হ্যাঁ।”
“ মারিয়া প্লীজ এর থেকেও ভালো অফার আমি তোমায় দিয়েছি। আমার সাথে কাজ করলে থিও কি অসুবিধে তোমার? কোনো কাজ করবে না তুমি । কোথাও যাবে না!"
মারিয়া করুন চোখে বলল।
“Patient-এর condition খুব critical জেকব প্লীজ …”
Jacob দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“Then why do you look terrified?”
এই প্রশ্নটাতেই মারিয়ার হাত থেমে গেল। কারণ সে নিজেও জানে না সে ইউভানকে দেখে বেশি ভয় পেয়েছে, নাকি নিজের দুর্বলতাকে।
সে জোর করে হাসল।
“New place… new people. That’s all.”
Jacob অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে।তারপর ধীরে বলল,
“If you feel uncomfortable there, leave immediately.”
মারিয়ার চোখ আবার ভিজে উঠল। কিন্তু দ্রুত চোখের জল মুছে ফেলল সে।
কারণ যদি Jacob সত্যিটা জানত—
তাহলে হয়তো এখনই তাকে নিয়ে লন্ডন ছেড়ে চলে যেতো। মারিয়া দ্রুত কাপড় গুছাতে লাগল।
কিন্তু তার কাঁপতে থাকা হাত দুটোই বলে দিচ্ছিল— সে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারছে না।
এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তেই Jacob আর কিছু বলল না।ধীরে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল।
মুহূর্তেই মারিয়ার সমস্ত শক্তি যেন ভেঙে পড়ল মুহূর্তেই।সে নিঃশব্দে Jacob-এর বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলল।আর ঠিক তখনই এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা কান্নাটা বেরিয়ে এলো।তার কাঁধ কাঁপছে।শ্বাস এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
Jacob শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরল।
এক হাত দিয়ে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
“It’s okay…
You’re safe.”
এই কথাটাতেই মারিয়ার বুকটা আরও মোচড় দিয়ে উঠল।Safe?না…
সে আর safe নেই।
কারণ ইউভান ফিরে এসেছে। রেহান ডিউক রয়েছে।মারিয়া চোখ বন্ধ করে আরও শক্ত করে Jacob-এর shirt আঁকড়ে ধরল।
তার মাথার ভেতর তখনও ঘুরছে গত রাতের দৃশ্যগুলো সে ফিসফিস করে বলল,
“I don’t want to go there…”
Jacob-এর হাত থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
“Then don’t.”
মারিয়া ধীরে মাথা নাড়ল।
“I can’t.”
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তার।
“Contract?”
খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল Jacob।মারিয়া কোনো উত্তর দিল না।তবুও Jacob বুঝে গেল।
সে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।তারপর মারিয়ার মুখটা আলতো করে তুলে ধরল।
“You don’t have to carry everything alone.”
মারিয়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল।কারণ এতগুলো বছর এই মানুষটাই তার পাশে থেকেছে।যখন surgery-র পর নিজের নতুন মুখটা দেখে সে ভেঙে পড়েছিল…
যখন রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে চিৎকার করে উঠত…প্রতিবার Jacob-ই তাকে সামলেছে।
তবুও আজকের সত্যিটা সে বলতে পারছে না।
কারণ সে জানে—
ইউভান বেঁচে আছে শুনলে Jacob তাকে কোনোভাবেই সেখানে ফিরতে দেবে না।
Jacob আবার ধীরে তাকে বুকে জড়িয়ে নিল।
“Whatever it is…
I’m not leaving you alone in this.”
শেষ মুহূর্তে কি মনে হতেই মারিয়া নিজেকে ছাড়িয়ে নিল জেকব এর বন্ধন থেকে। চোখের জল মুছে ফেলল দ্রুত। গাল গুলো রক্ত লাল হয়ে উঠেছে তার লজ্জায় অস্বস্তি তে। জেক
ব এর সাথে এতটা ঘনিষ্ঠ কখনোই হয় নি সে তবে আজ... জেকব নিজেও টিজিং হাসি টা দিতেই তার ইতস্তত বোধ হলেও নিশ্চিন্ত হলো। জেকব কে বিষয় টা জানায় নি সে!
চলবে?
কমেন্ট লাগবে আমার অনেক ।
Write a comment ...