60

পর্ব 3( Yuvaan Duke)

কালো ইতালিয়ান লেদারের জুতো প্রথমে মাটিতে স্পর্শ করল।

তারপর ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল লম্বা এক পুরুষ।

চারপাশের গার্ডরা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পড়ল।

কালো ওভারকোটে মোড়ানো দেহ, প্রশস্ত কাঁধ, আঙুলে রুপালি রিং— তার উপস্থিতিতেই যেন পুরো পরিবেশটা আরও ভারী হয়ে উঠল।

ভিড়ের মাঝে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।

“The Don…”

“Oh my God…”

“He’s finally back…”

ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একের পর এক জ্বলে উঠছে। কিন্তু লোকটার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।

বরফ শীতল ধূসর চোখ দুটো নির্লিপ্তভাবে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে।

যেন এই পৃথিবীর কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে না।

তার পাশেই দ্রুত এগিয়ে এলো তার পঁচিশ বছর বয়সী সর্বদা সঙ্গী ডেভিড!

" স্যার আর্জেন্ট! মিসেস আলেকজেন্দ্রী প্রচণ্ড অসুস্থ। আপনাকে তলব করেছেন!"

ঠিক তখনই এক ফ্লাইট এটেন্ডই এগিয়ে এসে বলল, মিস্টার ডিউক আপনার ফ্লাইট রেডি!

ইউভান গাঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল, cancel it!

এরপর ডেভিড এর দিকে ইশারা করতেই  ডেভিড মাথা নীচু করল। ইউভান গাড়ি তে উঠে বসল।

কালো SUV-টা তীব্র গতিতে লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে।

বাইরের শহরটা আলোয় ঝলমল করলেও গাড়ির ভেতরের পরিবেশ অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ।

সামনের সিটে বসে থাকা ডেভিড বারবার রিয়ার ভিউ মিররে তাকাচ্ছিল।পেছনের সিটে বসে আছে ইউভান। মাথা সিটে ঠেকানো, চোখ বন্ধ।

কিন্তু তার চোয়ালের শক্ত রেখা দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড অস্থিরতা কাজ করছে।

“কখন থেকে condition critical?”

কয়েক মিনিটের নীরবতার পর গভীর গলায় প্রশ্ন করল সে।

ডেভিড দ্রুত উত্তর দিল,

“এক ঘণ্টা আগে হঠাৎ collapse করেন। ডাক্তাররা বলছেন blood pressure dangerously low.”

ইউভানের চোখ ধীরে খুলে গেল।

ধূসর চোখদুটো বরফের মতো ঠান্ডা।

“Why didn’t anyone inform me earlier?”

ডেভিডের গলা শুকিয়ে এলো।

“মিসেস আলেকজেন্দ্রী নিজেই মানা করেছিলেন, Boss…”

কথাটা শুনে ইউভান আর কিছু বলল না। গ্র্যানি ছাড়া আপন বলে কি কেউ আছে তার? তার হঠাৎ এমন অবস্থা!

St. Edward City Hospital,

পুরো হাসপাতাল ইতিমধ্যেই security-তে ঘেরা।

SUV থামতেই ডজনখানেক লোক দ্রুত এগিয়ে এলো।ডেভিড নেমে দরজা খুলে দিল।

ইউভান ধীরে গাড়ি থেকে নামতেই চারপাশের ডাক্তার, নার্স, security সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পড়ল।

“Where is she?”

তার গম্ভীর কণ্ঠে মুহূর্তেই পুরো করিডোর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

একজন ডাক্তার দ্রুত সামনে এসে বলল,

“ICU, Mr. Duke…”

ডাক্তার টির নাম রেহমান বারিক । মিসেস আলেকজেন্দ্রীর সমস্ত  শারীরিক বিষয় তিনি দেখেন।

" “Mrs. Alexandrie is suffering from advanced melanoma.”

ইউভান এ শরীর শক্ত হয়ে উঠল।

“কি বললে রেহমান? গ্র্যানির লাস্ট স্টেজ স্কিন ক্যান্সার?!”

চমকিত কণ্ঠের উৎস খুঁজে সামনে তাকাতেই ইউভানের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল।

করিডোরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বড়ভাই রেহান।

এলোমেলো চুল, চোখ লাল, শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক দ্রুত। পোশাক দেখেই বোঝা যাচ্ছে তাড়াহুড়ো করে ছুটে এসেছে সে।

রেহানের চোখে জমে থাকা জল দেখে মুহূর্তের জন্য ইউভানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

“Answer me, doctor!”

রেহানের কণ্ঠ পুরো করিডোর জুড়ে কেঁপে উঠল।

ডক্টর রেহমান বারিক ভারী নিঃশ্বাস ফেললেন।

“আমরা প্রাথমিকভাবে ভেবেছিলাম সাধারণ skin infection… কিন্তু biopsy report আজ এসেছে। It’s advanced melanoma.”

করিডোর মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

ডেভিড পর্যন্ত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

ইউভানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

“Since when?”

তার ঠান্ডা গলায় প্রশ্নটা শুনে ডাক্তার কিছুটা ইতস্তত করলেন।

“সম্ভবত অনেক মাস ধরেই symptoms ছিল… কিন্তু উনি treatment properভাবে নেননি।”

“Why?”

এবার ইউভানের কণ্ঠে বিপজ্জনক শান্তভাব।

ডক্টর রেহমান ধীরে বললেন,

“উনি বলেছিলেন… পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে শান্তিতে কিছুদিন কাটাতে চান।”

কথাটা শুনে রেহান মুখ ঢেকে বসে পড়ল পাশের চেয়ারে।

“না… না… গ্র্যানি আমাদের ছেড়ে যেতে পারে না…”

তার কাঁপা গলাটা পুরো পরিবেশটাকে আরও ভারী করে তুলল।

কিন্তু ইউভান স্থির।অস্বাভাবিকভাবে স্থির।

কেবল তার মুঠোবদ্ধ হাতের নীলচে শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

মিসেস আলেকজেন্দ্রী… তার গ্র‍্যানি।

এই পৃথিবীতে একমাত্র মানুষ যিনি তাকে কখনও দানব হিসেবে দেখেনি। মা বাবার অনুপস্থিতিতে মানুষ করেছে।

হঠাৎ ICU-র দরজাটা খুলে গেল।একজন নার্স দ্রুত বেরিয়ে এসে বলল,

“Mr. Duke… she’s awake.”

“And… she’s asking for you.”

ইউভান ভেতরে প্রবেশ করল ঠিকই তার পেছনে রেহান ঢুকল তার সাথে।

“ইউভি… মাই চাইল্ড… তুমি এসেছো…”

দুর্বল কণ্ঠটা শুনেই ইউভানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

ICU-র সাদা আলোয় মিসেস আলেকজেন্দ্রীকে যেন আরও ভঙ্গুর লাগছে আজ। মুখ ফ্যাকাশে, হাতে অসংখ্য স্যালাইনের সূচ, অক্সিজেন মাস্কের পাশে কষ্টভরা নিঃশ্বাস।

তবুও ইউভানকে দেখেই বৃদ্ধার চোখে জল চিকচিক করে উঠল।

“গ্র্যানি…” ইউভান ধীরে তার বিছানার পাশে গিয়ে বসে পড়ল। এই মানুষটার সামনে এলেই তার ভেতরের সমস্ত কঠোরতা কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।

মিসেস আলেকজেন্দ্রী কাঁপা হাতে ইউভানের মুখ ছুঁয়ে দিলেন।

“আমি জানি না… আমার হাতে আর কতটা সময় আছে…” কথাগুলো বলতে বলতেই তার গলা ভেঙে এলো। “কিন্তু আমি মরার আগে… তোমাকে সুখী দেখতে চাই ইউভি…”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রেহান মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার এসব অসহ্য লাগলেও ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সে। অন্য কিছুর অপেক্ষা তে।

ইউভানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। “ তোমার কিছু হবে না গ্র্যানি।”

গ্র্যাণী মৃদু হাসলেন। “ডোন্ট লাই টু মি… আমি নিজের শরীরের অবস্থা বুঝি।”

“ইউভি…” মিসেস আলেকজেন্দ্রী দুর্বল হাতে ইউভানের আঙুল চেপে ধরলেন। “আমি মরার আগে শুধু একটা জিনিস দেখতে চাই…”

ইউভান নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

বৃদ্ধা কষ্টে নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, “তোমার সংসার…”

রেহান ধীরে চোখ বন্ধ করল। সে জানে এরপর কি আসতে চলেছে।

“লারা তোমাকে অনেক ভালোবাসে ইউভি…” মিসেস আলেকজেন্দ্রীর কণ্ঠ কেঁপে উঠল। “গত পাঁচ বছর ধরে মেয়েটা তোমার পাশে আছে। তোমার সব রাগ, সব অন্ধকার সহ্য করেছে…”

ইউভানের মুখে কোনো পরিবর্তন এলো না। বরফ শীতল ধূসর চোখদুটো স্থির।

কারণ তার কাছে এই কথাগুলো নতুন নয়।

গত পাঁচ বছর— একটা বিশাল শূন্যতা নিয়ে বেঁচে আছে সে।

“ইউভি…” গ্র্যানির কণ্ঠে আবার বাস্তবে ফিরল সে।

“লারা ভালো মেয়ে। আমি চাই তুমি ওকে বিয়ে করো…”

ICU-র ভেতর মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

রেহান ধীরে ইউভানের দিকে তাকাল। সে জানে এই বিষয়টা ইউভান সবসময় এড়িয়ে যায়। তবে আজ একটা আশা রয়েছে ।

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ইউভান ধীরে বলল, “Marriage isn’t important to me.”

“কিন্তু আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ…” মিসেস আলেকজেন্দ্রীর চোখ ভিজে উঠল। “আমি শান্তিতে মরতে চাই বেটা…”

কথাটা শুনে ইউভানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

সে মৃত্যু সহ্য করতে পারে। রক্ত সহ্য করতে পারে।

কিন্তু এই গ্র্যাণীর চোখের জল— না।

সেটা সে কখনো সহ্য করতে পারে না।

দীর্ঘ নীরবতার পর অবশেষে ইউভান ধীরে বলল,

“…If that makes you happy.”

রেহান বিস্ময়ে তাকিয়ে উঠল। ডেভিড পর্যন্ত মাথা দরজার আড়ালে নড়েচড়ে উঠল। মুখের ভাব দুশ্চিন্তা গ্রস্ত হয়ে উঠল

মিসেস আলেকজেন্দ্রীর কাঁপা ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। “তাহলে… তুমি রাজি?”

ইউভান কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ধীরে মাথা নাড়ল।

“Yeah.”

কথাটা বললেও বুকের ভেতর কোথাও অদ্ভুত একটা অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল তার।

যেন… সে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভুলে যাচ্ছে। মাথা চেপে ধরল পুনরায়। আহ্ এই অসহ্য ব্যথায় চোখ কুঁচকে এলো ইউভান এর। ডেভিড রীতিমত ছুটে এলো তার কাছে,  ম্যাম স্যার এর এক চেক আপ করাতে হবে। আমি ওনাকে নিয়ে যাচ্ছি।  ডেভিড কিছুটা আন্দাজ করতে পেরে ইউভান কে কেবিন থেকে নিয়ে এলো । কেবিনে উপস্থিত রেহান  গ্র্যানির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজল।

__________________________________

" ডাক্তার স্যার এর মাঝে মাঝেই এই অসহ্য ব্যথা টা হয়। স্যার কি আর পুরোনো স্মৃতি ফিরে পাবেন না?

ডেভিড এর  প্রশ্নে ডাক্তার ঘোষাল ভ্রু কুঁচকে বললেন, মিস্টার ডিউক তার জীবনের দুবছর কোমায় কাটিয়ে আবারও যে নিজের সাধারণ জীবনে ফিরে এসেছেন ঈশ্বর সহায় ছিল বলেই। নাহলে ওনার বাঁচার চান্স কম ছিল। যেহেতু মাথার চোট এত টাই গুরুতর ছিল ওনার জীবনের বেশ কিছু বছর মুছে গিয়েছে। তাও ভাল কারণ এমন অবস্থায় ব্যক্তি নিজের সমস্ত স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলে মিস্টার ডিউক এর জীবনের হয়তো ওইঘটনার পাঁচ বছর যাবত সমস্ত ঘটনা মুছে গিয়েছে।

ডাক্তার ঘোষাল চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন।

তারপর গম্ভীর দৃষ্টিতে ডেভিডের দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন,

“মিস্টার ডিউকের caseটা সাধারণ না।”

ডেভিডের বুকের ভেতর চাপা অস্থিরতা কাজ করছে। এই মানুষটার রাগ, নীরবতা, দুঃস্বপ্ন— সবকিছুর সাক্ষী সে।

“স্যার কি… memories ফিরে পেতে পারেন?”

ডাক্তার কয়েক সেকেন্ড চুপ রইলেন।

“Possibility আছে। কিন্তু সেটা dangerousও হতে পারে।”

ডেভিডের ভ্রু কুঁচকে গেল। “Dangerous?”

“হ্যাঁ।” ডাক্তার ঘোষাল গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “কিছু traumatic memory মস্তিষ্ক নিজেই block করে দেয়। কারণ সেই স্মৃতি মানুষটাকে mentally destroy করতে পারে।”

কথাটা শুনে ডেভিডের মুখ শক্ত হয়ে উঠল।

সে জানে। সেই রাতটার পর ইউভান আর আগের মানুষ ছিল না।দু’বছর coma।মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই।

আর জেগে ওঠার পর— সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া এক মানুষ।

“কিন্তু মাঝে মাঝে উনার মাথাব্যথা বাড়ে কেন?” ডেভিড নিচু গলায় প্রশ্ন করল।

ডাক্তার ধীরে উত্তর দিলেন, “কারণ subconscious mind কিছু জিনিস ভুলতে পারেনি।”

“কিছু trigger… কিছু মুখ… কিছু শব্দ— তার মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করে।”

ডেভিডের বুক ধক করে উঠল।

ঠিক তখনই বাইরে করিডোরে ভারী কিছু পড়ার শব্দ হলো।ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল ডেভিড।

“Boss?!”

দ্রুত দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই দেখল— করিডোরের দেয়ালে একহাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে ইউভান।

তার নিঃশ্বাস ভারী। কপালের পাশে নীলচে শিরা ফুলে উঠেছে।

আর ধূসর চোখদুটো অদ্ভুতভাবে ফাঁকা।

“স্যার—”

ইউভান ধীরে মাথা তুলল।

“David…”তার কণ্ঠ কর্কশ শোনাল।

“Why do I keep hearing… a woman crying?”

ডেভিডের শরীর মুহূর্তেই ঠান্ডা হয়ে গেল।

ইউভান কপাল চেপে ধরল শক্ত করে।

“আর একটা নাম…”

তার চোখের সামনে যেন হঠাৎ ঝলসে উঠল—

মাথার ভেতর তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল সে।

ডেভিড দ্রুত তাকে ধরে ফেলল। “Boss calm down!”

কিন্তু ইউভানের চোখ তখনও স্থির হয়ে আছে শূন্যে। ডাক্তার ঘোষাল দ্রুত এসে তার হাতে একটি ইনজেকশন পুশ করতেও ইউভানের ভারী শরীর টি বেডের ওপর এলিয়ে পড়ে। ডে

ভিড কোনো মতে চোখের জল আটকাল।  ইউভান তার বন্ধু দাদার মতো খুব কাছের একজন । এই পৃথিবীতে ইউভান ছাড়া তার কেউ নেই অথচ দিনের পর দিন এই মানুষ টাকে শেষ হয়ে যেতে দেখতে পারছে না সে!!

_____________________

চলবে?

Write a comment ...

Write a comment ...