59

( Season 2)পর্ব ২

লন্ডন,

Southend (SEN) Airport

ঠিক পাঁচ বছর পর আবারও লন্ডনের মাটিতে পা রাখল মারিয়া।

প্লেনের দরজা খুলতেই হিমশীতল বাতাস এসে ছুঁয়ে গেল তার মুখ। মুহূর্তের মাঝেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক চাপা অস্বস্তি জেগে উঠল।

এই শহরটা তার কাছে শুধুই একটা শহর নয়— অসংখ্য দুঃস্বপ্ন, বিশ্বাসঘাতকতা আর রক্তাক্ত স্মৃতির সমাহার।

এয়ারপোর্টের বাইরে তখন ভিড় জমেছে। কেউ ফুল হাতে প্রিয় মানুষকে স্বাগত জানাচ্ছে, কেউ দীর্ঘদিন পর পরিবারের কাউকে জড়িয়ে ধরছে। চারপাশে হাসি, উচ্ছ্বাস, পুনর্মিলনের দৃশ্য।

অথচ মারিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল না কেউ।

হঠাৎ ছোট্ট আয়রা তার হাত শক্ত করে ধরল।

“মাম্মা… ইটস সো কোল্ড!”

আয়রা নাক কুঁচকে মারিয়ার কোট আঁকড়ে ধরতেই মারিয়া নিচু হয়ে মেয়ের গায়ে জ্যাকেটটা ভালো করে জড়িয়ে দিল।

“জাস্ট আ লিটল মোর, বেবি।”

ঠোঁটে হাসি থাকলেও চোখ দুটো ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল তার।

পাঁচ বছর আগে এই শহর ছেড়েছিল সে মৃত মানুষ হয়ে।আজ ফিরেছে নতুন পরিচয়ে।

মারিয়া ক্লার্ক।

নামটা উচ্চারণ করতেই নিজের কাছেই অচেনা লাগে কখনও কখনও। কারণ আয়নার সামনে যে মুখটা এখন দেখা যায়, সেটা তার আসল মুখ নয়।

নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য, নিজের সন্তানকে বাঁচানোর জন্য— তাকে বদলে ফেলতে হয়েছিল সবকিছু।

মুখ।

পরিচয়।

অতীত।

কিন্তু স্মৃতি?

সেগুলো আজও রক্তক্ষরণের মতো তাজা।

ইউভানের নিথর দেহটা এখনো মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে তার কাছে।

সে নিজের চোখে দেখেছিল রক্ত… গুলি… মৃত্যু…। আজও অপরাধে ভোগে সে। হয়তো সেদিন সেও মারা যেতো কিন্তু তার সন্তান এর জন্য আজও শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে সে।  ইউভান আর বেঁচে নেই। এই সত্য টা আজও বিভীষিকার মতো লাগে তার কাছে। প্রাণ হাতে এই শহর থেকে পালিয়ে গিয়েছিল সে। মিহিরিমা ডিউক মৃত হয়ে যায় সমাজের কাছে । কিন্তু মিহিরিমা তো জানত তার খোঁজ ওরা পেলেই মৃত্যু নিশ্চিত। অবশেষে সমস্ত অতীত কে মুছতে পরিচয় , চেহারা পর্যন্ত পাল্টে  ফেলেছিল সে। মিহিরিমা সেদিন রাতেই মারা গিয়েছিল…তার ইউভানের সাথে।আজ যে নারীটা দাঁড়িয়ে আছে সে শুধু মারিয়া।এটাই এখন তার একমাত্র সত্য।

“মাম্মা…”

আয়রার নরম কণ্ঠে ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো মারিয়া। ছোট্ট মেয়েটা বড় বড় চোখে চারপাশ দেখছে। নতুন শহর, নতুন মানুষ সবকিছুই তার কাছে রোমাঞ্চকর।

“ আমরা কি এখন থেকে এখানে থাকবো মাম্মা?”

মারিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

এই শহরটা একসময় তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল। অথচ আজ আবার সেই শহরের কাছেই ফিরতে হয়েছে তাকে। ভাগ্যের কি পরিহাস! হাহ। কিন্তু এভাবে কতদিন তার মেয়েকে কষ্ট দেবে সে?

কারণ পালিয়ে বাঁচা আর সম্ভব নয়।আয়রার একটা ভবিষ্যৎ দরকার।একটা নিরাপদ জীবন। আপাতত এই শহরে তার জন্য দরকার কাজ।

এমা অনেক কষ্টে তার জন্য একটা ছোট প্রাইভেট ক্লিনিকে ইন্টারভিউ ঠিক করেছে। নতুন পরিচয় আর বদলে যাওয়া চেহারার জন্য আপাতত কেউ তাকে চিনতে পারবে না— অন্তত সেটাই আশা করছে সে।

“মাম্মা লুক!”

আয়রা হঠাৎ সামনে আঙুল তুলে উত্তেজিত গলায় বলে উঠল। রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা এক লোক বিশাল টেডি বেয়ার হাতে ছোট্ট একটা মেয়েকে জড়িয়ে ধরেছে।

দৃশ্যটা দেখে আয়রার চোখ চকচক করে উঠল।

“হি’স হার ড্যাড?”

প্রশ্নটা শুনে মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল মারিয়া।

বুকের ভেতর কোথাও পুরনো ক্ষতটা আবার ধীরে ধীরে জ্বলে উঠল। আয়রা কখনও নিজের বাবাকে দেখেনি।আর কোনোদিন দেখবেও না—এই বিশ্বাস নিয়েই এত বছর বেঁচে আছে সে।

মারিয়া ঠোঁটে ম্লান হাসি টেনে মেয়ের গালে হাত রাখল।

“হুম…”

“মাই ড্যাডি ওয়াজ হ্যান্ডসাম টু?”

প্রশ্নটা শুনে গলা শুকিয়ে এলো তার।

চোখের সামনে হঠাৎ ভেসে উঠল প্রথম দিন সাক্ষাৎ এর দৃশ্য টি একজোড়া ঠান্ডা ধূসর চোখ… সেই পরিচিত হাসি… ইউভানের কণ্ঠ…

“ইউ আর মাইন, মিহিরিমা। অনলি মাইন.”

মারিয়ার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল।

“মাম্মা?”

আয়রার ডাক শুনে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল সে।

“ইয়েস বেবি… তোমার ড্যাডি খুব হ্যান্ডসাম ছিল।”

“মোর দ্যান মি?”

ছোট্ট আয়রার গম্ভীর মুখ দেখে অজান্তেই হেসে ফেলল মারিয়া।

“নো… নো ওয়ান ইজ মোর বিউটিফুল দ্যান মাই আয়ু।”

আয়রা খিলখিল করে হেসে উঠতেই বহুদিন পর বুকের ভেতর সামান্য উষ্ণতা অনুভব করল সে।

ঠিক তখনই ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল—

Arthur Jacob Calling…

মারিয়ার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল।

কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো গভীর পুরুষালি কণ্ঠ—

“Did you land safely?”

“Yeah.”

“Good. Listen carefully, Maria…”

আর্থারের গলাটা হঠাৎ অস্বাভাবিক গম্ভীর শোনাল। কিন্তু মারিয়া তখন রাস্তা পার হচ্ছিল  আয়রা কে নিয়ে। কিন্তু লন্ডনের কিছু স্পেশাল সিকিউরিটির পোশাকধারী ব্যক্তি রা তার পথ আটকে দিল

" মারিয়া?"

" জেকব আমি তোমায় একটু পর ফোন করছি একটু ঝামেলা হয়েছে!"

মারিয়া ফোন টি কেটেই সিকিউরিটি দের তীক্ষ্ম গলায় বলল, কি করছেন আপনারা? আমাদের পথ কেনো আটকাচ্ছেন!

" সরি মিস। আমাদের বস এর ফ্লাইট রয়েছে। তিনি না যাওয়া পর্যন্ত এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া যাবে না!"

মারিয়ার ভ্রু কুঁচকে গেল। লন্ডনের এই অন্ধকার দুনিয়ার নিয়মগুলো সে খুব ভালো করেই জানে। এখানে কিছু মানুষ আইনের থেকেও বেশি ক্ষমতাশালী।

কিন্তু আজ তার মাথায় এসব ভাবার সময় নেই।সে আর এসবের অংশ হতে চায় না। তার মেয়েকে নিয়ে সারাজীবন কাটাতে চায়।

ছোট্ট আয়রা ঠান্ডায় কাঁপছে। দীর্ঘ ফ্লাইটের ক্লান্তিতে চোখ দুটো আধবোজা হয়ে এসেছে তার।

“মাম্মা… আই’ম টাইয়ার্ড…”

আয়রা তার কোট আঁকড়ে ধরতেই মারিয়ার দৃষ্টি নরম হয়ে এলো। নিচু হয়ে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিল সে।

“জাস্ট ফাইভ মিনিটস, বেবি।”

লোকগুলোর আচরণ দেখে মনে হচ্ছে যেন পুরো শহরটাই কারও জন্য থেমে গেছে। মারিয়ার বুকের ভেতর অজানা অস্বস্তি কাজ করতে শুরু করল।

দূরে হঠাৎ দশটি কালো SUV এসে থামল। মুহূর্তের মাঝেই চারপাশের পরিবেশ বদলে গেল। আরও কয়েকজন সশস্ত্র গার্ড দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সাধারণ লোকজন এর ভিড় জমতে থাকল। কিন্তু মারিয়া বিরক্ত দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে সরে আসে সেখান থেকে । ছোট আয়রা হা করে দেখতে থাকে মানুষের ভিড়। মারিয়া অন্য পথ ধরে ফাঁকা জায়গায় এসে একটি ক্যাব বুক করল দ্রুত।

“Your cab will arrive in two minutes.”

ফোনের স্ক্রিনে লেখা ভেসে উঠতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মারিয়া।

আয়রা তখন তার কাঁধে মাথা রেখে আধঘুমে চোখ বন্ধ করে আছে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে ছোট্ট শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এসেছে।

মারিয়া আলতো করে মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিল।

“আর একটু বেবি… তারপর আমরা রেস্ট করবো।”

দূরে তখনো কালো SUV-গুলোর চারপাশে মানুষের ভিড় জমে আছে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, সশস্ত্র গার্ড, চাপা গুঞ্জন— পুরো পরিবেশটা অস্বাভাবিক ভারী।

মারিয়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে চাইল না।

ঠিক তখনই ভিড়ের মাঝ থেকে কারও গলা ভেসে এলো—

" “The Don has arrived.”!”

শব্দটা শুনেই মুহূর্তের জন্য জমে গেল মারিয়ার শরীর।বুকের ভেতর পুরনো আতঙ্কটা যেন আবার ধীরে ধীরে জেগে উঠল।

না।এটা কেবল coincidence।নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল সে।কিন্তু অজান্তেই তার আঙুলগুলো আয়রার গায়ে শক্ত হয়ে চেপে বসেছে।

“মাম্মা…”

ছোট্ট কণ্ঠে ব্যথা মেশানো ডাক শুনে দ্রুত হাত আলগা করে দিল মারিয়া।

“সরি…”

আয়রা ঘুম জড়ানো চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ছোট্ট হাত দিয়ে মারিয়ার গাল ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল,

“ডোন্ট বি স্যাড…”

কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল তার।

ঠিক তখনই সামনে এসে থামল কালো রঙের ক্যাব।

ড্রাইভার জানালা নামিয়ে বলল,

“Maria Clark?”

“Yeah.”

মারিয়া দ্রুত দরজা খুলে ভেতরে উঠে বসল। আয়রাকে সাবধানে পাশে বসিয়ে দরজাটা বন্ধ করতেই বাইরের শব্দ অনেকটাই থেমে গেল।

“Destination, ma’am?”

মারিয়া ফোনের স্ক্রিনে এমা পাঠানো address-এর দিকে তাকাল।

তারপর ধীরে বলল,

“ blackwood Road.”

ক্যাব ধীরে ধীরে এয়ারপোর্ট ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই দূরের কালো SUV-এর দরজা খুলে গাড়ি থেকে নামল একজন যাকে ঘিরে এয়ারপোর্ট চত্বর ভি

ড়ে গিজ গিজ করছে!

______________________________________

রিভিউ ২০+ হলেই পরের পর্ব দেবো। কেমন লাগলো অবশ্যই জানাবেন।

Write a comment ...

Write a comment ...