Newzealand,
" Hey pretty girl , Can we be bf gf ?"
এমন প্রস্তাবে পাঁচ বছর বয়সী মেয়েটি মুখ ফুলিয়ে ফেলল। স্কুলে বেশিরভাগ এমন প্রস্তাব পেয়ে সে বিরক্ত। সমস্ত ছেলেরাই তাকে গার্লফ্রেন্ড বানাতে চায়। Isn't it irritating? Ofcourse । তবে হবে নাই বা কেনো! বয়স পাঁচ হলেও মুখ মন্ডল যেন পুতুলের ন্যায় মিষ্টি। চুল গুলো ব্রাউনিস , চোখের মণি নীল বর্ণের। সাদা ধব ধবে গায়ের রঙ ,গাল দুটো ফোলা ফোলা। হাসলেই তার সামনে গজ দাঁত টা যেন তার সৌন্দর্য কে বাড়িয়ে দেয়।
" হেই অ্যারা, তোর গ্র্যানি এসেছে নিতে,"
মেয়েটি কটমট চোখে তার সহপাঠীর দিকে তাকিয়ে বলল, ইটস আয়রা ওকে? নট অ্যারা।
" আয়ারা, পরশু দিন তোমাদের প্যারেন্টস টিচার মিটিং রয়েছে ওকেই? তোমার মম বা ড্যাড কাউকে নিয়ে আসবে"
ক্লাস টিচার এর কথায় আয়রার মুখের ভাব অন্ধকার ছেয়ে গেল। পেছন থেকে তার একজন সহপাঠী ফিক করে হেসে বলল, Mam she don't have parents , she just have a old granny!! Hahaha..
তার সাথে সাথে ক্লাসের অন্য স্টুডেন্ট রাও হাসতে শুরু করলে, আয়ারা চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। পিঠে ব্যাগ চাপিয়ে সে এক নিশ্বাসে ক্লাস রুম থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে।
" কি হয়েছে আমার ডল এর ? কাদঁছে কেন সে?"
আয়ারা ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে ছুটে তার গ্র্যানি কে জড়িয়ে হুহু করে কাদতে শুরু করে। বৃদ্ধ মহিলা টি বিচলিত হলেন , তার একমাত্র সম্বল তার নাতনি।
" এমা, আবার আমাকে দেখে সকলে হাসছিল। বলছিল আমার মম ড্যাড নেই , কেবল গ্র্যানি রয়েছে। কাল টিচার মিটিং এ মম বা ড্যাড কে ম্যাম আনতে বলেছে । আমার তো আসলেই কেউ নেই এমা। সকলে ঠিকই বলে আমি আনলাকি! "
এমার চোখে জল আসে কিন্তু সন্তর্পনে মুছে নেয়। সে আয়ারার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে তার গালে আদুরে ভাবে চুমু খেয়ে বললেন, এর জন্য আমার ডল কাদঁছে? তাহলে কি আজ তার ফেব্রেট ওয়াইট সস পাস্তা খাবে না?
মুহুর্তের মধ্যে আয়ারার চোখের জল নিমিষে বন্ধ হয়ে এলো। কিছুক্ষণ আগের মন খারাপ টা কেটে গিয়ে বিস্ময় এর ছাপ ফুটে উঠল তার চেহারায়।
" কিহহ ওয়াইট সস পাস্তা? রিয়েলি। প্লীজ এমা আমি খাবো , আমি খাবো"
এমার মুখে হাসি ফুটে উঠল। আয়ারা কখনোই বেশিক্ষণ মন খারাপ থাকতে পারে না একদম তার মায়ের মতো ।
" ইয়েই ওয়াইট সস পাস্তা, ওয়াইট সস পাস্তা!!"
" আয়ারা, আয়ারা আস্তে বেটা। গাড়ি আছে সামলে ..."
কিন্তু কে শোনে কার কথা, আয়ারা পুরো রাস্তা টাই দৌড়ে দৌড়ে ছুটে যাচ্ছিল। এমার ৬০ এর কোঠায়। স্বাভাবিক এই বয়সে তার শরীরে দৌড় ঝাঁপ বড্ড মুশকিল।
___________________________________
" আয়ারা বেটা, কাল স্কুলে টিচার মিটিং রয়েছে, জলদি ঘুমিয়ে পড়ো। কাল আমি যাবো তোমার সাথে ওকে?"
এমা আয়ারার কপালে চুমু খেয়ে তার মাথায় আদুরে স্পর্শ একে দিয়ে বলল। কিন্তু আয়ারা প্রত্যুত্তরে মৃদু হাসল কেবল। দোচালা একটি কাঠের বাড়ি তে থাকে তারা। আয়ারা স্কুল থেকে ফিরে বাকি সময় টা তার গ্র্যনির সাথেই কাটায়। এটা তার নতুন কিছু না। এমা আয়ারার পরনে ভালো মতো কম্বল টা জড়িয়ে লাইট টা বন্ধ করে রুম থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে যেতেই আয়ারা পিট পিট করে নিজের চোখ খুলল। এতক্ষণ সে চোখ বন্ধ করে করে রেখেছিল নয়তো এমা তার না ঘুমানো পর্যন্ত ।
আয়ারা ধীরে ধীরে পরণের কম্বল টা সরিয়ে উঠে বসল। তারপর সন্তর্পনে বালিশ টা উঁচু করে একটি ছবি বের করল সে।
" মাম্মা আই মিসড ইউ! "
আয়ারা তার মায়ের ছবি নিজের বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল । চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল বড় বড় ফোঁটা জল। এটা তার রোজ দিনের ঘটনা । রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় তার মায়ের ফটো বুকে জড়িয়ে ঘুমোয়। আজও তাই হলো। আয়ারা তার বুকের কাছে ছবি টা জড়িয়ে পুনরায় শুয়ে পড়ল কম্বল জড়িয়ে। বেশি দেরি করা যাবে না ,আয়ারা না গুড গার্ল? এসব ভাবতে ভাবতে তার চোখে ঘুম নেমে এলো দ্রুত।
_____________________________________
" Ayra where's your parents?"
ঘড়িতে তখন এগারোটা বাজে। প্রিন্সিপাল ম্যাম এর ডাকে উঠে দাঁড়াল আয়ারা সকলের সামনে। সে বার বার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল। গ্র্যানি তাকে বলেছিল সে এগারোটার মধ্যে স্কুলে চলে আসবে। কিন্তু কোথায় সে? আয়ারা চারপাশে তাকিয়ে দেখল তার সকল সহপাঠীর হয় বাবা নয় মা এসেছে । কিন্তু তার কেউ না!
" Mam Ayra is orphan " , সামনের বেঞ্চে বসা তার একটি সহপাঠী, ডরোথি কথা টি বলতেই রুমের একাংশ হো হো করে হেসে উঠল।
আয়ারা নিজের স্থানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে জল টলমল করছে। এমা তাকে কথা দিয়েছিল সে আজ আসবে কিন্তু.. সে কথা রাখে নি। সকলে তার মজা করছে.. । হাসছে। আয়ারার ছোট মন যেন খন্ড খন্ড হয়ে যাচ্ছে।
প্রিন্সিপাল ম্যাম আগাস্থা মেরি, সকলের উদ্দেশে কড়া গলায় বলল, স্টপ ইট স্টুডেন্টস। কারোর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে হাসা ঠিক নয়।
" বাট ম্যাম একজন ওরফান, এত বড় নোবেল স্কুলে পড়ার যোগ্য না। আমরা সকলেই নোবেল ফ্যমিলি থেকে বিলং করি!"
" হ্যা ম্যাম , একজন ওরফান এই স্কুলে কি করে পড়তে পারে! "
ডরোথির সাথে সাথে তার পাশের দুজন মেয়েও তার সাথে একই কথা বলে উঠল।
" ওরফান ওরফান ওরফান! "
এই শব্দ টা ভন ভন করে পাক খাচ্ছিল আয়রার মস্তিষ্কে।
.
.
.
.
.
.
.
" এক্সকিউজমি ম্যাম, আম মারিয়া ক্লার্ক, আয়রার বায়োলজিকাল মা"
ক্লাসে হঠাৎ এক নারীর আগমনে এতক্ষণের উত্তেজনা হঠাৎ নিস্তব্দ হয়ে গেল। নারী টির পরনে তখন মেডিক্যাল এর পোশাক, লম্বা লম্বা শ্বাস নিচ্ছে সে। যেন বেশ তাড়াহুড়োয় ছুটে এসেছে এখানে।
" মাম্মা! তুমি এসেছো!"
আয়রা জাস্ট এই কথা টুকু বলতেই চোখে অন্ধকার ছেয়ে গেল তার সামনে, শরীর টা এলিয়ে পড়ে যাওয়ার আগেই কেউ একজন তাকে ধরে ফেলে। এ স্পর্শ তার খুব কাছের। তার জন্মদাত্রী মা এর। তার মা সত্যি এসেছে। আর কিছু ভাবার আগেই চোখ বন্ধ হয়ে এলো তার।
_____________________________________
" এমা লাইক সিরিয়াসলি, এমন একটি স্কুল যেখানে আমার বেবী দিনের পর দিন হেনস্থা হচ্ছে আর আমি চুপ চাপ বসে থাকবো। কখনোই না। ওই স্কুলে আমার আয়ু আমার পড়বে না। অন্য স্কুল খুজবো তার জন্য"
মারিয়ার গলা শানের মতো তীক্ষ্ণ ছিল। তার চোখ বিছানায় শুয়ে থাকা ঘুমন্ত আয়রার ওপর পড়তেই চোখ ভিজে এলো নিমিষে।
" বেটা , এটা সম্ভব নয়"
" কেনো সম্ভব নয়! এখানে না হলে অন্য জায়গায় যাবো। কিন্তু এই স্কুলে আমার আয়ু আর পড়বে না"
এমা কিছু বলার আগে এক পুরুষালি ব্যক্তিত্ব বলে উঠল,
" মারিয়া , এখানের সব স্কুলেই ভর্তি হতে মা বাবার তথ্য জরুরী। আশা করি বুঝেছো। তাই যা করতে হবে ভেবে চিন্তে"
মারিয়া স্থির হয়ে রইল। পুরুষটির কন্ঠ তাকে কিছুটা হলেও শান্ত করল। বাস্তব এটাই যে আয়রার স্কুলে ভর্তি খুব একটা সহজ কাজ নয় তাও এই দেশে!
পুরুষটি মারিয়ার সম্মুখে এসে তার চোখে চোখ রেখে বলল, তবে একটা রাস্তা রয়েছে, লন্ডন!
মারিয়ার চোখের দৃষ্টি শক্ত হয়ে এলো। হাতের মুঠো শক্ত করে চেপে ধরলো সে।
" লন্ডন এমন একটা জায়গা সেখানে সিঙ্গাল মাদার দের প্রাধান্য দেওয়া হয়, সন্তান বড়ো করতে তার পিতার প্রয়োজন হয় না, মা এর তথ্য হলেই চলবে!"
" আর্থার! তুমি জানো তুমি কি বলছো?"
" আমি ভেবে চিন্তেই কথা বলছি মারিয়া, এখন সবটা তোমার সিদ্ধান্ত "
আর্থার আয়রার ঘুমন্ত মুখে আদুরে হাত বুলিয়ে, এমার সামনে এসে দাঁড়াল।
" আন্টি তোমার মেয়ে কে সমালোনোর দায়িত্ব এখন তোমার। ছয়দিন পাঁচ রাত ডিউটির পর, রীতিমতো ছুটে আসতে হয়েছে এখানে। "
এমা আর্থার এর হাত ধরে বিনতি গলায় বলে, বেটা, তুমি আমাদের জন্য যা করছো, এগুলোর ঋণ কখনোই শোধ করতে পারবো না।
আর্থার রীতিমতো এমা কে জড়িয়ে ধরল । তারপর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল, তোমার মেয়ে তো সেটা মানতেই চায় না।
তারপর আর্থার মারিয়া আর আয়রার দিকে স্নেহ ভরা দৃষ্টি তে তাকিয়ে বেরিয়ে যায়। এমা তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আর্থার জেকব দেশ ও বিদেশের নামকরা ডার্মাটোলজিস্ট। মারিয়া তার আন্ডারে নার্স এর কাজ করে। কিন্তু আর্থার কে তিনি ছেলের মতোই ভালোবাসেন। এমা নার্স থাকাকালীন , তার হাসপাতালে আর্থার ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করেছে। তাদের সম্পর্ক অনেক টাই গাঢ়।
" বেটা ? আমি কখনও তোমাকে জোড় করি নি। তোমার জীবনের গুরুত্বপুর্ন সিদ্ধান্ত তুমি নিয়েছো। লন্ডনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত টাও তোমার ওপরই ছেড়ে দিলাম"
কথা টি বলে এমা রুম থেকে বেরিয়ে গেল। মারিয়া স্থির হয়ে মেয়ের ঘুমন্ত মুখমন্ডল এর দিকে তাকিয়ে ছিল। এই মুখের আদল তার খুব কাছের একজন এর মতো। আয়রার মুখ মন্ডল এর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মারিয়ার বুকের মাঝে চিন চিনে ব্যথা অনুভব হলো। আজ স্কুলের ঘটনা তার মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। মারিয়া জানে। সে নিজেও তো তার মেয়েকে কতই বা সময় দিতে পারে! চোখের জল বাঁধ মানল না তার। ঠিক পাঁচ বছর আগে এই পুতুল টাকে জীবন মরণের মাঝে জন্ম দিয়েছিল সে। তার এক মাত্র বেঁচে থাকার মাধ্যম। অথচ বাইরের জগৎ নিয়ে এত টাই ডুবে গিয়েছিল যে ভুলে গিয়েছিল তার আয়রার কথা। যাকে বাঁচিয়ে রাখতে নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে।
মারিয়া নিজের স্থান থেকে উঠে দাঁড়াল। হেঁটে এসে কাবার্ড এর লক টা খুলে একটি ছবি বের করল সে। তারপর আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। ফটো টা চোখের সামনে ধরে পুনরায় আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকাল সে। ছবি তে থাকা নারী টা বহু আগেই মৃত এই দুনিয়ার কাছে। যাকে নিজে হাতে মেরেছিল সে। নিজের জন্য, তার মেয়ের জন্য। আয়নার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে তাকে কেউ চেনে না। মুখমন্ডল , নাম, পরিচয় ভিন্ন। দুনিয়ার কাছে মারিয়া ক্লার্ক। কিন্তু তার আত্মা একই রয়েছে। একই ক্ষত, বহু বছর আগের ভুল ,সকলের নৃশংসতা তার মনে এখনো তাজা। লুকিয়ে থাকার সময় শেষ হয়ে এসেছে।
লন্ডন যেখানে সে নিজের সবটা শেষ করে এসেছিল একসময়, তা মুখোমুখি হওয়ার সময় এসে গিয়েছে।
________________________________________
Write a comment ...