48

“Calm Before the Storm”

" মিসেস লেরিন এখন আউট অফ ডেঞ্জার!"

দীর্ঘ ৮ ঘণ্টা অপরেশন এর পর ডাক্তার এর এই কথা টুকু কেবিনে অপেক্ষা রত সকলের মাঝে শান্তির বার্তা রূপে কাজ করে।

মিহিরিমা উত্তেজনায় জড়িয়ে ধরে মিস ফ্লোরা কে। তাদের দুজনের চোখেই আনন্দ অশ্রু। মিহিরিমা যেনো তার হাতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ঘড়িতে তখন ভোর পাঁচটা বাজছে। তারা কেউ রেস্ট করতে যায় নি খাওয়া তো দূরেই থাক। ইউভান বহু বার খাওয়ার কথা বললেও মিহিরিমা নিজের জেদে মুখে কিছু তোলে নি। ইউভান জোড় করে নি সে নিজেও ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল পুরোটা সময়। চোখ মুখ এর ভাব অস্পষ্ট তার।

" ম্যাম এখন চলুন কিছু খেতে, স্যার অপেক্ষা করছে। অনেক ক্ষণ হলো আপনি কিছু খান নি!"

ডেভিড তার চিরাচরিত প্রোফেশনাল ভাবে বলল।

মিহিরিমা তার ফ্লোরা আন্টির দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল, না ডেভিড । এখন কি ..

" বেটা, যাও খেয়ে নাও। আমরা সবাই খেয়েছি, কিন্তু তুমি খাও নি বলে মিঃ ডিউক ও মুখে কিছু তোলেন নি। আমি অনেকবার বলেছি তবুও.. যাও উনি তোমার অপেক্ষা করছে"

ফ্লোরা আন্টির কথায় মিহিরিমার গাল গরম হয়ে উঠল। ইউভান তার জন্য রাত থেকে না খেয়ে আছে। মিহিরিমার পেটের ভেতর শিরশিরে অনুভুতি হলো।

মিস ফ্লোরা কে বিদায় জানিয়ে  ডেভিড এর সাথে মিহিরিমা একরাশ ইতস্তত বোধ নিয়ে এসে পৌঁছায়, হাসপাতাল এর ক্যান্টিন এ। পুরো জায়গাটা ফাঁকা থাকলেও হল রুমের মাঝে একটা বিশাল টেবিল এ রকমারি খাবার রাখা রয়েছে। তার মুখোমুখি টেবিল এ বসে আছে ইউভান, পরণে শার্ট টা হাতের কুনই অবধি গোটানো, পেশীবহুল হাত গুলো যেনো শার্ট কে আঁকড়ে রেখেছে। মাঝের দুটো বোতাম খোলা। রাতের ঘুম না হওয়ায় চুল গুলো এলেমেলো, না চাইতেও মিহিরিমা চোখ দিয়ে সব টা পর্যবেক্ষণ করে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল।

নিজের মনেই প্রশ্ন করল, মিঃ ডিউক এত সুন্দর না হলে কি অসুবিধা হতো!"

"  অত দূর থেকে তাকিয়ে না থেকে বসেই না হয় আমায় পর্যবেক্ষণ করবে। খাবার গুলো না হলে ঠান্ডা হয়ে যাবে!"

মিহিরিমা হকচকিয়ে গেল। কারণ ইউভান পুরোপুরি তার ফোনে মগ্ন মিহিরিমা ভাবেই নি সে এভাবে ধরা খেয়ে যাবে। তার নিজের ছন্নছাড়া ব্যবহারে নিজেও বিরক্ত সে। মুখে কোনো শব্দ না করে ইউভান এর ঠিক পাশের চেয়ারে  আসতে করে বসল ।

খাবার নিজে মুখে তোলার আগে মিহিরিমা মিনমিনে গলায় বলল, আপনিও খান প্লিজ। আমি খাচ্ছি তো।

ইউভান এবার খানিক টা সোজা হয়ে বসল। ডেভিড কে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকায় সে কমান্ড করল, Leave!

ডেভিড মাথা নত করে সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে যায় নিমিষে।  ইউভান চোখের দৃষ্টি নরম হয় মিহিরিমার ক্লান্ত মুখ খানি দেখে।

মিহিরিমা ইতস্তত হয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করল, আপনিও খান প্লিজ।

ইউভান শান্ত কন্ঠে বলল, খাইয়ে দাও।

মিহিরিমার চোখ প্রশস্ত হয়ে ওঠে ইউভান এর হটাৎ আবদারে। কানের পাটা লাল হয়ে ওঠে।

মিহিরিমা চোখ নামিয়ে নিল। হাতের চামচটা কেঁপে উঠল সামান্য।

“কি… কি বলছেন আপনি? আমি… আমি কিভাবে…”

ইউভান হালকা ভ্রু তুলল, ঠোঁটে টিজিং হাসি বজায় রেখে বলল,

“ডোন্ট ওভারথিংক, বাটারফ্লাই। তুমি খেতে বলেছ, আমি খাচ্ছি। কিন্তু… তোমার হাত থেকে।”

তার গলার স্বরটা এতটাই শান্ত অথচ গভীর ছিল, যে মিহিরিমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। মনে হলো পুরো ক্যান্টিন ফাঁকা নয়—বরং প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি আলো তাদের দু’জনকেই তাকিয়ে দেখছে।

ধীরে ধীরে এক চামচ খাবার তুলে ধরল সে। হাত কাঁপছে, চোখ নামানো। কিন্তু ইউভান একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে।

চামচটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে আসতেই ইউভান বিন্দুমাত্র চোখ না সরিয়ে খাবারটা মুখে নিল।

তারপর শান্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—

“গুড গার্ল।”

শব্দগুলো মিহিরিমার কানে বাজতেই গাল লালচে হয়ে উঠল। বুকের ভেতরে শিরশির করে এক অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে গেল।

“আমি কেন থেমে যাচ্ছি না? কেন তার দিকে তাকালেই সব ভুলে যাচ্ছি? যেই মানুষটা কে সে বিয়ে করেছিল একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে। নিউজপেপার এর রিপোর্টিং ইউভান এর সাথে ফটো টা যেভাবে ভাইরাল হয়েছিল সবটাই সে আগে থেকে জানতো।  নামহীন নাম্বার টা প্রথম দিন থেকেই প্ল্যান মাফিক কাজ করতে বলেছে। পুরো বিয়েটা সাজানো ছিল সেই মতোই সবটাই প্ল্যান মিহিরিমা জানতো । কিন্তু এক পর্যায়ে এসে সব কিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তার । যার বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করতে এসেছে তাকেই মিহিরিমা নিজের সেফ প্লেস বানিয়ে ফেলল কি করে!!জিভের মধ্যে তিতকুটে স্বাদ অনুভব হলো মিহিরিমার।

চামচ থেকে শেষ খাবার টা মুখে তুলে

ইউভান হটাৎ গাঢ় স্বরে বলল, আমায় কিছুদিন এর জন্য দুবাই যেতে হবে।

ইউভানের কণ্ঠের গভীরতা মিহিরিমাকে স্তব্ধ করে দিল।

চামচটা হাত থেকে সরে গিয়ে থালার একপাশে ঠক করে পড়ল।

“কি… বললেন? দুবাই?”

মিহিরিমার কণ্ঠ যেন নিজেরই কানে অচেনা শোনাল।

ইউভান শান্ত মুখে তার চোখে তাকাল।

“হ্যাঁ। অফিসের যে প্রজেক্ট টা ওখানকার অফিসেই প্রেজেন্ট করা হচ্ছে।”

মিহিরিমা ঠোঁট চেপে ধরল। ভিতরে ভিতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করল

“কেন এত খারাপ লাগছে? এ তো আমার সুযোগ হওয়া উচিত ছিল। ও না থাকলে আমি নিশ্চিন্তে আমার কাজ করতে পারতাম। প্রমাণ জোগাড়… সব। তবু কেন মনে হচ্ছে ও চলে গেলে আমি… একা হয়ে যাবো?”

ইউভান হঠাৎ সামান্য ঝুঁকে এল। মিহিরিমার হাতের ওপর  আলতো স্পর্শ রেখে বলল—

“তুমি নিজের খেয়াল রাখবে। আমি যত দিন না আসছি ভিলা থেকে কোথাও বের হবে না। বের হলে সবসময় বডিগার্ড থাকবে সাথে। কিন্তু তুমি প্রতিশ্রুতি দাও, আমি না আসা অবধি বেপরোয়া কিছু করবে না।”

তার গলার স্বর এতটাই দৃঢ় অথচ কঠিন যে, মিহিরিমার অজানা রাগ কাজ করল। প্রজেক্ট এ সেও কাজ করেছে কোই তাকে জানানো হয় নি দুবাই তে রাখা হবে এক্সিবিশন টা। শেষ মুহূর্তে এসে

ইউভান কি নিজেকে বেস্ট প্রমাণ করতে আবার ও মিহিরিমা কে বন্দী করে রাখতে চাইছে!

চোখ নামিয়ে সে জেদ দেখিয়ে  শুধু বলতে পারল—

“ কোনো দরকার নেই বডিগার্ড এর । আমার কথা চিন্তা না করলেও হবে। "

ইউভান এর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সে সবসময় অপছন্দ করে মিহিরিমার এই জেদি স্বভাব টা। নিজের একটি হাত দিয়ে অনায়াসে মিহিরিমার চেয়ার টেনে ধরতেই। মিহিরিমা মুখ খিঁচিয়ে বলে ওঠে, এই কি করছেন আপনি অসহ্য লোক ।

ইউভান   এবার মিহিরিমার কোমড় শক্ত করে চেপে নিমিষেই নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নেয়।

" আরে আপনি..."

" শসসসস!"

ইউভান মিহিরিমা কে থামিয়ে তার কানের কাছে মুখমন্ডল টা নিয়ে যেতেই , মিহিরিমা কেঁপে ওঠে। ভেতরের রাগ টা লজ্জায় পরিণত হয়। ইউভান এর গরম নিশ্বাস মিহিরিমার শরীর কে শিহরিত করে তুলছে অনায়াসে। মিহিরিমার নিজের প্রতি রাগ হলো, এই মানুষটার সামনে সে কি করে এত সহজে  গলে যাচ্ছে।

মিহিরিমা অস্বস্তি-লজ্জায় ফিসফিস করে বলল,

"Let me go… someone might see us."

ইউভান মৃদু হাসল, তার কানের কাছে গরম নিশ্বাস ছড়িয়ে দিল।

"Let them see. I don’t care. You are mine, Mihirima. Only mine."

মিহিরিমার শরীর কেঁপে উঠল। মাথার ভেতর দুইটা কণ্ঠ লড়াই করছে—

“এটাই তো সুযোগ, দূরে ঠেলে দে ওকে।”

আরেকটা কণ্ঠ ফিসফিস করছে—

“কিন্তু কেন এভাবে তার ছোঁয়া পেলে নিজে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে সে?”

সে চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ঠান্ডা গলায় বলল,

"You don’t own me, Mr. Duke."

ইউভান ভ্রু কুঁচকালো, তার ঠোঁটে টিজিং স্মার্ক ফুটে উঠল।

"Say that again, looking into my eyes."

মিহিরিমা সাহস করে চোখ তুলতেই ইউভানের দৃষ্টি যেন তাকে বন্দী করে ফেলল। চোখের ভেতর রাগও আছে, কিন্তু তারচেয়েও গভীর এক অধিকারবোধ।

"  জাস্ট কয়েকদিন এর জন্য। মিহিরিমা, প্লিজ। আমার সাথে কোনো ডিসকাস না করে কোনো বিষয় নিয়ে ওভার্থিংক করবে না ওকে?। তুমি না চাইলেও তোমার সাথে সবসময় আমি থাকবো। এন্ড আই মিন ইট।"

মিহিরিমা থমকায়। এত রুথলেস, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষকে আজ পর্যন্ত দেখে নি কারোর কাছে মাথা নত করতে, প্লিজ শব্দ টা ব্যবহার করতে। কিন্তু এই প্রথম  ইউভান এর কন্ঠ কাঁপছিল। গলায় আকুতি ছিল কিন্তু কেনো?

দুবাই থেকে ফিরলেই মিহিরিমা তার মনের কথা  ইউভান কে জানিয়ে দেবে। বাবার মৃত্যু, বিয়ের সত্যতা আর সব শেষে তার অনুভূতি। যেটা অজান্তেই তার মন মস্তিষ্কে বাসা বেঁধে ফেলেছে গাঢ় ভাবে। না চাইতেও এই মানুষটাকে সে আর ঠেলে দিতে পারবে না নিজের জীবন থেকে।

"যদি আমি সব সত্যি বলে দিই… ও

কি বিশ্বাস করবে? "

অজান্তেই সে মাথাটা এলিয়ে দিল ইউভানের প্রশস্ত বুকে। যেন ভেতরের ঝড়টা কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল।

Write a comment ...

Write a comment ...