মিহিরিমা আর ইউভান দশ মিনিট ড্রাইভ করে সেন্ট মেরি হসপিটাল এ পৌঁছায় । সেখানেই মিহিরিমার মা কে ভর্তি করা হয়েছে। মিহিরিমা কেঁদে কেঁদে চোখ মুখ ফুলে উঠেছে। ইউভান তাকে কোনো ভাবেই শান্ত করাতে পারছে না।
রিসেপশন এ জিজ্ঞেস করে তারা কেবিনে এসে পৌঁছায়। যেখানে মিস ফ্লোরা কে পায়চারি করতে দেখল মিহিরিমা।
" আন্টি মম .. মম ইজ ওকে না? কাদঁছো কেনো তুমি। ওহ গড!"
মিহিরিমা ভাঙ্গা গলায় বলে ওঠে। তার এই পৃথিবী তে মা ছাড়া কেউ নেই। সে কোনোভাবেই মা কে হারাতে পারবে।
" মাই চাইল্ড, কাম ডাউন বেটা। লেরিন ঠিক হয়ে যাবে। ডাক্তার দেখছে তাকে। "
মিস ফ্লোরা মিহিরিমা কে কোনো মতে সামলে বললেও তিনি নিজেও মনের দিক থেকে ভেঙে পড়েছেন। ইউভান মুখের মাস্ক টা ঠিক করে ,এক পলক চিন্তিত স্ত্রী কে দেখে ফোন টা দিয়ে খানিক টা দূরে সরে গেল। ঠিক সেই সময় কেবিন থেকে ডাক্তার বেরিয়ে আসে। তাকে দেখতেই মিহিরিমা ছুটে যায়।
" প্লিজ ডাক্তার আমার মা কে ঠিক করে দিন। আমি সারা জীবন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো।"
" Oh my God. You are Mr. Duke's wife na?.. I saw your wedding pictures in social media."
মিহিরিমা মাথা নাড়ল কেবল। নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে কোনো মতে জিজ্ঞেস করল, ডাক্তার আমার মা এর অপারেশন?
" হ্যা five thousand pounds পেইমেন্ট করলে আমারা অপারেশন শুরু করবো মিসেস ডিউক। "
ডাক্তার চলে যেতেই মিহিরিমা ধপ করে বসে করল পাশের সিটে। এত টাকা ! এত গুলো টাকা সে কোথায় পাবে এখন।
" মাই চাইল্ড! আমি জানি টাকার অংক টা অনেকটাই বেশি। আমার যত টুকু সামর্থ্য আমি হেল্প করবো । প্লিজ শান্ত হও।"
মিহিরিমা বিগলিত হলো ফ্লোরা আন্টির কথায়। চোখে জল এলো। আন্টির হাত আঁকড়ে ধরা গলায় সে বলল, তোমায় কি বলে যে ধন্যবাদ দেবো... কিন্তু তারপরও টাকা টা অনেকটাই বেশি। আমার কাছে যত টুকু রয়েছে।
" বেটা একবার মিঃ ইউভান কে জানিয়ে নাও। সে তোমার হাসবেন্ড। তুমি নিজে কি করে এত টাকা ..."
হটাৎ ই মিহিরিমা শক্ত কন্ঠে বলে ওঠে, আন্টি আমি চাই না আমার মম এর জন্য তার কাছে কিছু চাইতে। সে মম কে এখানে এনে ভর্তি করিয়েছে আমি তত টুকু তেই কৃতজ্ঞ।
শেষ কথা টুকু বলতে গিয়ে তার কথা গুলো ধরে এলো। ইউভান তাকে কিছু না জানিয়েই এখান থেকে চলে গিয়েছে। মিহিরিমার ভেতর টা খা খা করে উঠল । ইউভান কে ডিস্টার্ব করতে সে চায় না।
উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দুর্বল শরীরে পা হরকে গেল মিহিরিমার। মিস ফ্লোরা শক্ত করে চেপে ধরলো তার বাহু। ওনার চোখে মুখে চিন্তা গ্রাস করেছে মিহিরিমার অবস্থা দেখে।
" নার্স নার্স! প্লিজ চেক হার। এখনই পড়ে যেতে নিয়েছিল সে!"
মিহিরিমার মাথা টা ঝিম ঝিম করছে তবুও সে মিস ফ্লোরা কে আটকে বলল, আন্টি কিছু হয় নি আমার প্যানিক করো না প্লীজ। দুর্বল লাগছে একটু। আমায় যেতে হবে। টাকার ব্যবস্থা টা...
আর কিছু বলার আগেই মিস ফ্লোরা কড়া গলায় বললেন, লেরিন এর হয়ে সব দায়িত্ব আমি করে এসেছি তোমার। এই দুর্বল শরীরে আগে চেক আপ করবে তারপর সব কিছু।
" কিন্তু আন্টি.. এত টাকা!!"
" আমি তো আছি। আমি দেখছি। প্লিজ নার্স ওকে নিয়ে যাও"
মিহিরিমা মুখ ফোলাল। ফ্লোরা আন্টির জেদে নার্স এর সাথে কেবিন রুমে আসে সে। এত টাকার জোগাড় কিভাবে করবে এত কম সময়ে মাথার মধ্যে একটাই চিন্তা গ্রাস করে চলেছে তার।
হাতে সূচ ফোটানোর ব্যথায় আধো চোখে দেখল নার্স টি তার বেশ খানিক টাই রক্ত নিয়েছে। খানিক ক্ষণ এর মধ্যে চোখের সামনে অন্ধকার ছেয়ে যায় তার।।
________________________________________
ঘড়িতে তখন বেলা তিনটে বাজে। চোখ খুলতেই মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করল মিহিরিমা। হাতে লাগানো নল গুলো ছড়াতে ছটপট করে উঠল সে।
ঠিক সেই সময়
রোগাটে শরীরে যে নার্স টি তার চেকাপ করল সে এসে হাতের স্যালাইন খুলে দিল ।
" ম্যাম আপনি উঠে গিয়েছেন। ডোন্ট প্যানিক। আপনার মা একদম ঠিক হয়ে যাবে। অপারেশন শুরু হয়ে গিয়েছে!"
মিহিরিমা নিজের মাথা মাথা ধরে উঠে বসল। চোখ পিটপিট করে অস্থির গলায় বলল, কি তুমি আমার সাথে মজা করছো তাই না?
" ম্যাম আমি সত্যি বলছি। আপনার হাসবেন্ড আপনাকে দেখতে এসেছিল আপনি তখন জ্ঞানে ছিলেন না। ভাগ্য করে এমন হাসবেন্ড পেয়েছেন ম্যাম। কে চেনে না ওনাকে । এত ফেমাস একজন ব্যক্তি , কি ভালোবাসে আপনাকে।"
নার্স টির কথায় অজান্তেই মিহিরিমার গাল লালচে হয়ে এলো। লাজুক মুখে নিজের ঠোঁট কামড়ে সে বলল, কোথায় আছে আমার হাসবেন্ড?
" উনি বাইরের করিডোর এ আপনার আন্টির সাথে কথা বলছেন। "
মিহিরিমা উঠে দাঁড়াতে গিয়েও খানিকটা দুর্বল বোধ করে। মাথায় যেনো কেউ বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে।
" ম্যাম! আস্তে। আপনি কিন্তু এখনো দুর্বল। আপনার টেস্ট এর রিপোর্ট টা ডাক্তার এর কাছে পাঠানো হয়েছে। ওনার সাথে কথা বলে নেবেন"
নার্স টি মুচকি মুচকি হাসছিল। মিহিরিমা যদিও বুঝলো না এরকম এক্সপ্রেশন এর মানে কি। আপাতত নিজের শরীরের চাইতে মা কে দেখা টা বেশি জরুরী মনে হলো তার। নার্স কে বিদায় জানিয়ে করিডোর এ প্রবেশ করার আগেই ফ্লোরা আন্টির কথা গুলো কানে আসতেই মিহিরিমা থমকে গেল। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল এক জায়গায়।
" মিঃ ডিউক আমি চিরজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো লেরিন এর চিকিৎসায় এতগুলো টাকা পেমেন্ট করার জন্য। কেবল তাই নয়, রোজকার খাবার খরচ ডাক্তার ঔষুধ সব কিছু দিয়ে তুমি আপনাদের হেল্প করে আসছো। আমাদের মিহি খুবই ভাগ্যবান তোমার মতো হাসবেন্ড পেয়ে!"
মিহিরিমা স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল ইউভানের চোখের দিকে।
সেই চোখে আজ যেন অন্য এক পৃথিবী খুঁজে পেল সে_____ এক অদৃশ্য ভরসার হাত। যা ইউভান অজান্তেই তার পরিবার এর পাশে এসে দাঁড়াল। কেবল আজকেই নয় বরং এর আগেও নিঃশব্দে অনেক কিছু করে গিয়েছে যা মিহিরিমা ঘুনাক্ষরেও টের পায় নি।
তার বুক কেঁপে উঠল। এতদিন যাকে ঘৃণা করে এসেছে, তার উপস্থিতি ও আজ শরীরে এক অচেনা উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছে
মনের ভেতরটা গলে যেতে লাগল ধীরে ধীরে।
"সে কেন এমন করছে? আমি তো কখনো চাইনি... তবুও আমার মাকে বাঁচাতে নিজের সব দিয়ে দিলো...
যদি এই মানুষটাই আমার আসল আশ্রয় হয়?"
অশ্রু ঝরে পড়ল মিহিরিমার চোখ থেকে, কিন্তু সেটা আর নিছক দুঃখের জল নয়। সেখানে মিশে আছে কৃতজ্ঞতা, মিশে আছে অজানা টান।
করিডোর এ ইউভান আর মিস ফ্লোরা দুজনেই টের পেল মিহিরিমার উপস্থিতি। ইউভান এর দৃষ্টি নরম হলো মিহিরিমার চোখের জল দেখে।
ইউভান ধীরে তার মুখের সামনে ঝুঁকে এল, কণ্ঠস্বরটা নরম করে জবাব দিল,
“ক্রাইং উইল নট হেল্প, মিসেস ডিউক। ইউ নীড টু বি স্ট্রং।”
মিহিরিমা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
কাঁপা হাতে ইউভানের হাতটা আঁকড়ে ধরল সে। তার চোখে প্রশ্নের ভান্ডার থাকা সত্ত্বেও চুপ থাকল সে। মিহিরিমা আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভেতর থেকে। তার মনে আর কোনো দোটানা নেই । স্পষ্ট সেই অনুভুতি। এই মানুষটা তার ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে।
"আমি তাকে ঘৃণা করতে চাই… কিন্তু পারছি না। কেন জানি মনে হচ্ছে, আমি ধীরে ধীরে তাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি..."
নিজের মনের অনুভূতি টা উপলব্ধি করতেই শিরশিরে অনুভুতি হলো মিহিরিমার ।
ভেতরে ভেতরে প্রথমবারের মতো বুকের মধ্যে এক নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেল সে।
কোনো ঝড় যদি তাদের দিকে আসে, তবুও এই মানুষটা তার ঢাল হয়ে দাঁড়াবে—এই বিশ্বাস অজান্তেই জন্ম নিলো মনে।
কিন্তু কে বলতে পারে হটাৎ ঝড় কখন চলে আসে।
________________________________________
লন্ডনের ফাইভ স্টার বারে
দুজন কালো সুট পরিহিত ব্যক্তি তখন বিশেষ আলোচনায় মত্ত।
" মিহিরিমা কে একটা শিল্ড দিয়ে ঘিরে রেখেছে ইউভান ডিউক। ফার্ম হাউসে কড়া পাহারা এমনকি মিহিরিমার সাথে সবসময় গার্ড থাকে। তার ধারে কাছে ঘেঁষতে পারবে না কেউ!"
অন্যজন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে উঠল,
" ইউভানের বাহু তে যে গুলি টা লেগেছিল সেটা আমার ই লোক করেছিল। তবে নিশানা মিস হয়েছে বলেই টাক করে বেঁচেগেল। সেদিন রাতেই ফার্ম হাউসে মিহিরিমার ওপর নজর রাখছিল কিন্তু শালা ইউভানের লোক তাকে ধরতেই তার বডি কেটে কুকুর কে খাইয়েছে দি গ্রেট ইউভান ডিউক। কি পরিমান হিংস্র "
কথাটা শুনতেই মদের গ্লাস হাতে থাকা লোকটির ভ্রু কুঁচকে গেল। হালকা আলোয় তার মুখ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু কণ্ঠস্বরের ভারই যথেষ্ট—
“Enough.”
ধীরেসুস্থে গ্লাস টা টেবিলে নামাল সে। আলোয় স্পষ্ট হলো মুখটা।
যার সাথে স্বয়ং ইউভান ডিউকের রক্তের সম্পর্ক—তার বড় ভাই, রেহান ডিউক।
তার ঠোঁটে কুটিল হেসে বলল।
" আমার ভাইকে মেরে ফেলা এত সহজ নয়। তার একমাত্র দুর্বলতা কে কাজে লাগাতে হবে! তারপর ই না তাকে ভাঙতে পারবো আমরা?"
বারের কাচের দরজা ঠেলে ঢুকল লম্বা গড়নের মেয়েটি। লাল স্লিট ড্রেস, লম্বা হিল, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক—তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন চারপাশের পুরুষদের চোখ টেনে নিচ্ছে নিজের দিকে। সে ধীর ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো রেহানের টেবিলের দিকে।
রেহান গ্লাস থেকে এক চুমুক হুইস্কি গলায় ঢেলে বলল,
"লারা তোমার ই অপেক্ষায় ছিলাম।"
লারার চোখ জ্বলে ওঠে প্রতিহিংসায়। ইউভান এর করা প্রতিটা অপমানে তবু ও সে ইউভান কে চায় । যে কোনো ভাবেই ওই মেয়েটাকে তার সহ্য হয় না।
" জিজু আমি নিজেকে স্থির রাখতে পারছি না। তুমি জানো আমি ইউভান কে কত টা চাই। আজ পর্যন্ত বহু পুরুষের সঙ্গে থেকেও ইউভান ডিউক কে তার চাই! একরাতের জন্য হলেও!"
" তবে গেম শুরু করে দাও।
এমন প্ল্যান করো, মিহিরিমা নিজে থেকেই সরে যায় ইউভান এর লাইফ থেকে এরপর ইউভান তোমার আই প্রমিজ!"
লারার মুখে নিমিষেই ক্রুর হাসি খেলে গেল।
Write a comment ...