অন্যপ্রান্ত থেকে এক তাড়াহুড়ো ভরা গলা শোনা গেল—
“স্যার, খুব খারাপ একটা নিউজ… অফিসের এক ক্লায়েন্টকে ব্রুটালি খুন করা হয়েছে। পুলিশ আসতে পারে। আপনি দ্রুত চলে আসুন।”
—খুন!
মিহিরিমা কিছু বলার আগেই ইউভান তার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিল।
শোয়া অবস্থাতেই, ঠাণ্ডা চোখে, মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল—স্পিকার অন থাকায় মিহিরিমা প্রতিটা শব্দই শুনতে পাচ্ছিল।
কিন্তু তার নিজের মনে হঠাৎ অদ্ভুত এক শিরশিরানি নামল।
গলা শুকিয়ে এলো… বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।
কাল রাতের সেই স্বপ্ন… রক্ত, ছুরি, আর কারো নিথর দেহ—
ওটা কি শুধু স্বপ্ন ছিল,
নাকি…?
এই ফোন কলের পর থেকে মিহিরিমার মন বড্ড ছন্নছাড়া হয়ে উঠেছে। ইউভান এর জখম আগের থেকে অনেক টাই শুকিয়েছে তাই সে আবার ও অফিস যাবে আজ থেকে। কাল রাতের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের পর সকালে তাদের মাঝে তেমন কিছু মুহূর্ত তৈরি হয় নি। মূলত বলতে গেলে ইউভান বহু বার মিহিরিমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলেও সে এড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেনো এটা সে নিজেও জানে না!
" মিহি দি তুমি আজ অফিস যাচ্ছ?"
মিহিরিমা এত দিন পর অফিস যাওয়ার জন্য পুনরায় রেডি হয়েছে যদিও ইউভান তাকে বলে নি এই চাকরি তাকে করতেই হবে ... তবে সে ইচ্ছে করেই এই কাজ টা ছাড়বে না। তার মায়ের চিকিৎসার জন্য আপততো অনেক অর্থের প্রয়োজন। মিহিরিমা নিজে অর্জন করে তা দিয়ে মায়ের চিকিৎসা করাবে!
এসব ভাবতে ভাবতে মিহিরিমা রোজির গাল ধরে বলল, খুব জলদি চলে আসবো। মন খারাপ করো না।
" আমি তোমায় মিস করবো মিহি দি! এই ভিলায় আগে আমি প্রচণ্ড একা ফিল করতাম কারণ বাকি মেড রা সিনিয়র সকলেই, আমি সবার ছোট। তুমি আসার পর স্যার তোমার দায়িত্ব আমায় দিল। আমি সেদিন খুব খুশি হয়েছিলাম। "
মিহিরিমা মুচকি হেসে রোজী কে জড়িয়ে ধরল। মেয়েটা এত মিষ্টি মনে হয় খালি আদর করতে । সত্যি ভিলায় রোজী না থাকলে সে একা কখনোই থাকতে পারতো না।
রোজী হটাৎ তাড়াহুড়ো করে বলল, এবাবা স্যার তোমায় ডাকতে বলেছিল তিনি বাইরে অপেক্ষা করছে বাইরে, জলদি যাও ।
মিহিরিমা লম্বা শ্বাস নিল , এত দিন পর অফিসে যেতে খানিক টা নার্ভাস ফিল হলেও মুখে হাসি টেনে রোজী কে বিদায় জানিয়ে লনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অডি টা দেখল সে। ইউভান এক ভাবে তার পথের দিকেই যেনো তাকিয়ে আছে। হটাৎ কালকের কিছু মুহূর্ত চোখের সামনে ভেসে আসতেই মিহিরিমা নিজের ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলে নেয়।
গাড়ির দরজা খুলতেই উষ্ণ কফি আর ইউভানের পরিচিত পারফিউমের গন্ধ মিহিরিমার নাকে ধাক্কা খেল।
সে ধীরে ভেতরে ঢুকে সিটবেল্ট বাঁধল, চোখ নামানো—যেন তার দৃষ্টি আর ইউভানের চোখ মেলাতে চাইছে না।
ইউভান কোনো কথা বলল না, শুধু ইঞ্জিন চালু করল।
মিনিট পাঁচেক নীরবতা।
রাস্তায় ছুটে চলা শহর, আর গাড়ির ভেতরে চাপা এক অদৃশ্য বোঝাপড়া চলছে।
হঠাৎ ইউভান এক ঝলক তার দিকে তাকাল।
গভীর, নিরীক্ষণী দৃষ্টিতে।
“তুমি কি ইচ্ছে করে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ, মিসেস ডিউক?”
মিহিরিমা চমকে উঠল।
“কি… না তো!”—তার কণ্ঠে লুকোনো অস্থিরতা ধরা পড়ে গেল।
ইউভান শীতল গলায় বলল,
“কাল রাতে তুমি আমাকে নিজে টেনে নিয়েছিলে তোমার কাছে। Hope you remember clearly. আর আজ সকাল থেকে এমন আচরণ করছো যেন আমরা অচেনা!?”
মিহিরিমা গলাটা পরিষ্কার করে জানালার বাইরে তাকাল। সে ইউভান এর সাথে দৃষ্টি মেলানোর সাহস পেল না।
“অফিসের কাজের কথা ভাবছিলাম…”
ইউভান হালকা ঝুঁকে এল। এক হাতে স্টিয়ারিং, আরেক হাতে ধীরে তার গালে স্পর্শ করল।সে বড্ড ডেসপারেট গলায় বলল,
“look at me god damn it.. You belong to me. তোমার ইগনোরেন্স আমার সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। Please… talk to me. I beg you, my jana. If you want to hit me, hit me. But please… don’t stay silent.”
শেষের কথাগুলো যেন ভেতরে কোথাও আঘাত করল মিহিরিমাকে। কাল রাতের স্মৃতি, দুজনের বাহুডোরের উষ্ণতা, সেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও বুকে জমে থাকা নরম কিছু অনুভূতি—সব মিলিয়ে বুকের ভেতরটা হঠাৎ নরম হয়ে গেল তার।
সে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে ইউভানের দিকে তাকাল। তার চোখে অদ্ভুত এক ঝিলিক—না রাগ, না পুরোপুরি ভালোবাসা—শুধুই গভীর টান ছিল ।
পরের মুহূর্তে, নিজের অজান্তেই সামনের দিকে ঝুঁকে তার ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল ইউভানের ঠোঁটে।
চুম্বনটা ছিল ধীর,
ইউভান প্রথমে বিস্মিত হলো, তারপর নিঃশ্বাসের সাথে মিহিরিমাকে আরও কাছে টেনে নিল… যেন বাইরে পুরো দুনিয়া থেমে গেছে, শুধু তাদের দুজন ছাড়া।
গাড়ি রাস্তার এক কিনারে দাড়িয়ে দুজনেই তখন গভীর চুম্বনে ডুব দিয়েছে। মিনিট পাঁচেক পর মিহিরিমার শ্বাস ফুলে আসলে ইউভান তাকে ছেড়ে দেয়। মিহিরিমা মুখে লাজুক হাসি বর্তমান, সে নিজেও এই কাজের জন্য অস্বস্তি তে পড়েছে। মিহিরিমা মুখ লোকাতে ইউভান এর বুকে মুখ গুঁজে থাকে।
ইউভান ফিসফিস করে হেসে বলল,
“তুমি যেটা স্বপ্নে দেখেছিলে সেটা এক জিনিস, আর আজকের ঘটনা পুরোপুরি ভিন্ন। দুটো এক করো না, butterfly.”
মিহিরিমা ধীরে বলল,
“কিন্তু… অফিসে খুন হলো কেন? হঠাৎ?”
ইউভান বেশ শক্ত অথচ ধীর স্বরে উত্তর দিল,
“একজন গার্ড… তার ভাই শত্রুতার বশে তাকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে। That’s it.”
মিহিরিমা লম্বা শ্বাস নিল। হয়তো অযথাই ভয় পেয়েছিল সে। স্বপ্ন তো সত্যি হয় না—
ইউভান আবার স্টিয়ারিং ধরল।
“আজ একটা মিটিং আছে upcoming প্রজেক্টের ওপর। কিন্তু আমার wife যদি এমন হঠাৎ হঠাৎ রোমান্টিক হতে থাকে, আমি সামলাবো কীভাবে বলো তো, darling?
মিহিরিমা কিনা শেষে মিঃ ডিউক এর কথায় লজ্জা পাচ্ছে। গাল দুটো গরম হয়ে উঠেছে তার।
___
---
কালো রং এর অডি টা কাচে মোড়া আকাশছোঁয়া দালান, এর সামনে দাড়াতেই, গেটে দাঁড়িয়ে থাকা সিকিউরিটি, আর ভেতরে স্টাফ দের মাঝে চাপা গুঞ্জন ভেসে আসে।— “Mr. Duke এসেছেন…”
গাড়ি থামতেই চারজন গার্ড একসাথে দরজা খুলে দাঁড়াল। ইউভান বিন্দুমাত্র শব্দ না করে নামল। তার চারপাশে এক অদৃশ্য বলয় তৈরি হয় যেখানে উপস্থিত সবাই তার ভয়ে কাঁপছে, অথচ চোখে এক ধরনের শ্রদ্ধার ভাব বিরাজমান।
মিহিরিমা তার পিছনে হেঁটে চলেছে। নিজের অজান্তেই বুকটা ধড়ফড় করছে তার। বাইরে সবাই যাকে থরথর করে কাপ , সেই মানুষটাই তো কয়েক মিনিট আগে গাড়ির ভেতর ওর ঠোঁটে ডুবে ছিল। এই বৈপরীত্যটা মাথা ঝিমঝিম করাচ্ছিল তাকে।
“Good Morning, Sir,and Mam” একে একে সবাই শুভেচ্ছা জানাল, কিন্তু কারো সাহস হলো না চোখে চোখ রাখার। মিহিরিমা কে মিঃ ডিউক এর ওয়াইফ হিসেবে অনেকে আপত্তি ও সমালোচনা
করলেও মুখের সামনে বলার সাহস আজ অবধি কারোর হয় নি!
ইউভান কনফারেন্স রুমে ঢুকতেই সবার ওপর যেন চাপা অস্থিরতা নেমে এলো। টেবিলের মাথায় বসে সে শুধু একবার হাত তুলল—
“Sit.”
এক সেকেন্ড দেরি করলেই হয়তো শাস্তি জুটবে—এমন ভয়ে সবাই একযোগে যার যার নিজের সিটে বসে পড়ল।
মিহিরিমা পাশে দাঁড়িয়েছিল। ইউভান হঠাৎ তার দিকে তাকাল, দৃষ্টি স্থির, যেন চোখ দিয়েই কিছু আদেশ করল। সে বুঝল—এখানে কে boss, সেটা ভুলে গেলে চলবে না।
অন্যদিকে, মিহিরিমার বুকের ভেতর ধকধক চলছেই। এই মানুষটার দুটো রূপ—তার সাথে থাকাকালীন যেই নরম দৃষ্টি সে প্রত্যক্ষ করে তা বাইরের জগতের কেউ যেনো ভেদ করতে পারবে না। বাইরে যেনো মানুষ আলাদাই খোলসে মুড়ে ফেলে নিজেকে যা মিহিরিমার মনেও ভয় ধরায়।
_________________________
ঘরটা অল্প আলোয় ডুবে রয়েছে। একপাশে বড় জানালার পর্দা আধখোলা, বাইরের নিয়ন আলো মাঝে মাঝে ভেতরে ঢুকে পড়ছে।
চেয়ারের হাতলে আঙুল ঘুরিয়ে বসে আছে এক ব্যক্তি। তার পরনে কালো রং এর পোশাক দ্বারা আবৃত —শান্ত, স্থির, যেন দুনিয়ার কিছুই নাড়াতে পারবে না তাকে।
হঠাৎ—
দরজা কড়কড় শব্দে খুলে গেল।
এক ভৃত্য-সদৃশ লোক নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে দাঁড়াল। গলায় কাঁপুনি নিয়ে বলল—
“বস… আমাদের একজন… মারা গেছে।”
এক মুহূর্তের জন্য চেয়ারের হাতল শক্ত করে চেপে ধরল সে। চোয়ালের পেশি ফুলে উঠল, কিন্তু মুখে কোনো আবেগ নেই—শুধু ঠোঁটের কোণে অতি ক্ষীণ এক হাসি।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, জানালার দিকে হাঁটতে হাঁটতে সিগারেট জ্বালাল। ধোঁয়া বেরিয়ে মিলিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে।
গভীর, ঠাণ্ডা স্বরে সে বলল—
“কে রয়েছে এর পেছনে, হাবিব?”
হাবিব গলাটা ভিজিয়ে নিল, তবুও কণ্ঠ কেঁপে উঠল—
“সে বুঝে গিয়েছিল আমরা তার পেছনে লোক লাগিয়েছি… রোহান হয়তো অনেক কিছু জেনে গিয়েছিল, তাই… তাই এই ভয়ংকর মৃত্যু…”
বসের চোখে এক ঝলক আগুন জ্বলে উঠল।
পরের মুহূর্তেই সে হুংকার দিয়ে টেবিলের ওপরের সবকিছু ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে।
“Panther! Panther! Panther!
—যে নিজের পরিচয় লুকিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মালিক সেজে বসেছে? আমার একের পর এক প্ল্যান ভেস্তে দিচ্ছে! হাবিব… আকাশ-পাতাল যেখানেই হোক, খুঁজে বার করো এই Panther-কে! আর আমি খুব ভালো করে জানি… সেই মুখোশের আড়ালে কার মুখ থাকতে পারে!”
হাবিবের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা ঘাম নেমে এলো।
“বস… আজ রাতে মেয়েগুলোকে নিয়ে সৌদি রওনা দেব আমরা?”
“প্ল্যানের কিছুই বদলাবে না!”—বসের গলা এখন বরফ ঠাণ্ডা।
“যে আমাদের পথে দাঁড়াবে, সোজা টপকে দেবে।”
হাবিব মাথা নত করে সম্মতি জানাল।
---হাবিব দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যেতেই ঘরে এক মুহূর্তের জন্য গভীর নীরবতা নেমে এলো।
শুধু জানালার বাইরে থেকে ভেসে আসা শহরের হালকা গুঞ্জন, আর টেবিলে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কাঁচের শব্দ।
বস ধীরে ধীরে সিগারেটের শেষ টানটা নিয়ে ,
তারপর ডেস্কের ড্রয়ারের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বের করল একটা পুরনো চামড়ার ফাইল—মলাটে সোনালি অক্ষরে খোদাই করা একটাই শব্দ: PANTHER।
সে ফাইল খুলল না, শুধু আঙুল দিয়ে নামটার ওপর বুলিয়ে নিল—যেন শিকারি নিজের শিকারের গন্ধ চিনে নিচ্ছে।
মুখে একেবারে ঠাণ্ডা, হিসেবি হাসি ফুটল।
পাশের টেবিল থেকে একটা স্যাটেলাইট ফোন তুলে নিল, নম্বর টিপল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর অন্য প্রান্তে গলা শোনা গেল।
বস ধীরে, খুব ধীরে বলল—
“Plan B শুরু করো… আর এবার, খেলা টা ঠিক অন্য রকম হবে। যেমন
টা আমি প্রথম থেকে সাজিয়েছি। এখন সময় এসেছে সেই দুর্বলতা কে অস্ত্র করার!!"
ফোনটা কেটে গেলেও ব্যক্তিটির ভয়ংকর হাসি টা যেনো পুরো ঘর ময় গম গম করতে থাকে।
Write a comment ...