41

Unknown Call 💢

" লিসেন মিঃ ডিউক, এই ওষুধ গুলো ভালো মতো খেয়ে নেবেন । আর অফিসের কাজ থেকে একদম বিরত থাকবেন , ওকে?"

মিহিরিমা ক্যাজুয়াল একটা ড্রেস পরে  রেডি হয়েছে তার মা এর সাথে দেখা করতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু তার আগে ইউভান কে স্পষ্ট ভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে, কোন ওষুধ কখন খেতে হবে। ইউভান এর যদিও মন নেই সেই দিকে, সে মুখ টা ভার করেই হুম জাতীয় শব্দ বের করল কেবল।

মিহিরিমা উঠে চলে যাওয়ার আগেই ইউভান যার হাত টেনে ধরে, মিহিরিমা পেছন ঘুরে ইউভান এর গাঢ় নীলচে রং এর চাহনি তে এমন কিছু ছিল যা তার হৃদয়ে চিন চিনে ব্যথা অনুভব করাল।

সে এগিয়ে এসে ইউভান এর খস খসে গালে হাত বুলিয়ে মৃদু কন্ঠে বলল, আমি বিকেলের মধ্যে ফিরে আসবো। ট্রাস্ট মি।

" I'm waiting for you!",, ইউভান এর কথা টি এত টা ধিমে ছিল যে কারোর শ্রুতিগোচর সম্ভব নয়। বিছানায় এলিয়ে রাখা শরীর টি দেখল কেবল মিহিরিমা র রুম ত্যাগ করার দৃশ্য। ইউভান  তার দুর্বল শরীর টা এলিয়ে দিল বিছানায়। একাকীত্বের জীবনে এই প্রথম ইউভান ডিউক এত দুর্বল বোধ করছে নিজেকে। হারানোর ভয় তাকে জেঁকে বসেছে ,কোনো ভাবে নিজের অজান্তেই।

___________________________________

মিহিরিমা  যে কত দিন পর তার মা কে সামনে থেকে দেখল , তার যেনো আনন্দের হিসেব নেই। মিস ফ্লোরা ভাবতেই পারেন নি মিহিরিমা অবশেষে আসবে।

" মাই চাইল্ড কতদিন পর তোমায় দেখলাম। এত শুকিয়ে গিয়েছ কেনো মিহি!!"

মিহিরিমা মৃদু হেসে মিস ফ্লোরা কে জড়িয়ে ধরল। মিস ফ্লোরার শরীর বেয়ে ভেসে আসা মা মা গন্ধ টা মিহিরিমা র বড্ড পছন্দের।

" মম কোথায় আন্টি?"

মিস ফ্লোরার সাথে মিহিরিমা তাদের বেডরুমে পৌঁছাতে দেখল তার মম লেরিন তাদের একটা ফ্যামিলি পিকের দিকে এক ভাবে তাকিয়ে আছে। যেখানে তার মম পাপা আর সে রয়েছে। মিহিরিমার নিঃশব্দে চোখ ভিজে ওঠে ।

" মম!"

মিহিরিমা র কাপা গলা টা মৃদু শোনালেও মিসেস লেরিন এর হাতের আঙুল সামান্য নড়তে  দেখল মিস ফ্লোরা।

" ওহ গড, মিহি তোমার ডাকে লেরিন রেসপন্স করছে।,"

মিসেস লেরিন রেসপন্স না করতে পারলেও তার অনুভূতি ঠিক ই সজীব রয়েছে। মেয়ের উপস্থিতি একটু হলেও মাতৃ হৃদয় ও অনুভব করতে পারছে। মিহিরিমা মা এর হাতে চুমু খেল অগুনতি। তারপর তার কোলের কাছে মাথা গুঁজে বহু দিন পর আবার ও মা মা গন্ধ টা প্রাণ ভরে অনুভব করল সে।

" মিহি মাই চাইল্ড, লেরিন কে ডাক্তার বলেছে উপযুক্ত  চিকিৎসার অভাবে তার মাথায় ক্লড জমে যাচ্ছে পুনরায়। তোমার বাবার ইনসিডেন্ট এর পর স্ট্রোক করেই আজ লেরিন এর একপাশ অকেজো হয়ে গিয়েছে। অপারেশন না করলে হয়তো সে পুরোপুরি ভাবে অনুভূতি হীন হয়ে যাবে!!"

" নাআআ !!,, আন্টি এটা কখনও হবে না। মম কে কিছুতেই হারাতে দেবো না আমি। ",, মিহিরিমা মায়ের কোল আঁকড়ে ধরে ফুঁসে উঠল ।

" মিহি ডাক্তার জানিয়েছে অনেক টাকার বিষয়। এত টাকা কিভাবে??.."

" আমি জোগাড় করবো তুমি নিশ্চিন্ত থাকো  আন্টি মম এর চিকিৎসার জন্য ।"

মিহিরিমা  তার মায়ের কোল ঘেঁষে মাথা গুঁজে রইল । সে যে করেই হোক টাকার জোগাড় করবে । হিসেব অনুযায়ী সে তো এখনো ইউভান এর আন্ডারে কাজ করছে তার অফিসে।  ইউভান হয়তো আর তাকে কাজ করতে দেবে না কিন্তু মিহিরিমা যে করেই হোক নিজের জব ছাড়বে না।

" মিহি , ডিয়ার তোমার ফোন কখন থেকে বেজে যাচ্ছে, কখন থেকে ডাকছি খেয়াল নেই কেনো? এই নাও"

মিহিরিমা খেয়াল হলো সেই তখন থেকে মায়ের কোলে মাথা রেখেই নিজের ভাবনায় মশগুল ছিল সে। ফ্লোরা আন্টির ডাকে মায়ের কোল থেকে মাথা তুলে দেখল তার মা চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু তার হাত টা মিহিরিমার মাথা স্পর্শ করছে। হয়তো এত দিন পর মায়ের মন ও অনুভব করছে তার মেয়েকে।

মিহিরিমা মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে বিছানায় শুতে সাহায্য করল। কিন্তু ক্রমাগত ফোনের রিং বাজতে থাকলে মিস ফ্লোরা এসে বললেন, মিহি তুমি ফোন টা ধরো, হয়তো তোমার হাসবেন্ড ফোন করেছে। আমি লেরিন কে দেখছি।

মিহিরিমা সামান্য লজ্জা পেল । আন্টির মুখে হাসবেন্ড শব্দ টি শুনে তার পেটের মাঝে প্রজাপতি উড়ছিল যেনো । আসলেই তো কখন এই বাড়িতে এসেছে একবার ও ফোন করা হয় নি  ইউভান কে ।

এক মিনিট ! তার কাছে তো নাম্বার ও সেভ নেই। ইউভান তাকে ফোন আগে করলেও মিহিরিমা কখনোই তার নাম্বার সেভ করে নি ইচ্ছে করে।

ফোন টা হাতে তুলতেই আবার ও রিং বেজে ওঠে তার।  মা এর ঘুমন্ত মুখ দেখে সে ফোন টা হাতে চেপে স্টোর রুমের ফাঁকা জায়গা টায় আসল কথা বলার জন্য।

লম্বা শ্বাস নিয়ে লাজুক হেসে ফোন টা কানে ধরতেই খানিক নিস্তব্ধতার পর গম গমে আওয়াজে

এক চিরচেনা কন্ঠ। না ইউভান নয় বরং ..

মিহিরিমার মুখটা পলকে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ফোনটা হাত থেকে পড়ে যেতে যেতে সে কোনোমতে ধরে ফেলল।

"কে? কে আপনি?", কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল সে।

ফোনের ওপাশ থেকে সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

"যে প্রতিশ্রুতি তুমি করেছিলে... সেই খেলাটা কি ভুলে গেলে? ইউভান ডিউক কে ভালোবেসে ফেলেছ নাকি এখন?"

মিহিরিমা চুপ। তার হৃদয় যেন হঠাৎ থেমে গিয়েছে।

আমি কিছুই ভুলিনি। তবে ইউভান আমার সঙ্গে কখনো বাজে ব্যবহার করেনি।"

তার গলা কাঁপছিল, তবুও সে বলল, "আর আমার বাবার মৃত্যুর জন্য ইউভান-ই দায়ী — এটা এত সহজে বলাও যায় না। তোমার দেওয়া তথ্যে ফাঁক ছিল।"

ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা বিরাজ করলেও, হাহা করে ভয়ংকর হাসি দিয়ে যেনো,

আবার কণ্ঠটা ও বলে উঠল, এবার যেন আরও কঠিন, আরও চেপে ধরা গলায়

"তুমি এখন দ্বিধায় পড়েছ, তাই তো? আমি জানতাম এই দিনটা আসবে। তুমি আমায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে — ইউভানের সমস্ত তথ্য আমার হাতে তুলে দেবে। কিন্তু এখন তুমি যখন হোঁচট খাচ্ছো, আমি জানি কিভাবে তোমায় সরাসরি সত্যের মুখোমুখি করাতে হয়।"

মিহিরিমা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল।

"তুমি আসলে কে? কেন তুমি এসব বলছো আমাকে?"

"যদি সত্য জানতে চাও, ইউভান ডিউকের স্টোর রুমে যাও। পুরোনো ফাইল গুলো খোঁজো।

তোমার বাবার মৃত্যুর আগের মাসের অফিস ডকুমেন্টস — বিশেষ করে 'ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন' নামের ফোল্ডারটা।

"দেখো, তোমার এই তথাকথিত ‘ভালোবাসা’ কতটা নির্মল… আর কতটা নকল!"

মিহিরিমা এবার রেগে উঠল।

"তুমি আবার ফোন করো না! আমি নিজের চোখে সব দেখে বুঝব সত্যটা।"

"সেটাই তো চাই।", ফোনের ওপাশে হাসি শোনা গেল।

"তুমি বুঝবে কে তোমার শত্রু, কে তোমার প্রেম। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে, মিসেস ডিউক।"

"কিন্তু মনে রেখো, আমি আছি… তোমার খুব কাছেই। প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি পদক্ষেপে।"

ফোনটা কেটে গেলেও মিহিরিমা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট অনিশ্চয়তা। ধীরে ধীরে সে চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নিল — এই স্টোর রুমটাই যেন তার ছোটবেলার জাদুঘর।

বহু পুরোনো খেলনা, পুতুল, কাঠের ট্রেন, আর সেই বাদামী টেডি, আর একটা ছোট বাক্স — সবকিছুই যেগুলো একসময় তার পাপা কিনে দিয়েছিল।

"আমি দ্বিধায় ভুগছি পাপা…

আমার মন কেন যেন বিশ্বাস করতে চাইছে না যে মিঃ ডিউকের জন্যই এই সবটা হয়েছে।

অফিস থেকে যেসব তথ্য ফাঁস হয়েছিল, সেটা আমিই করিয়েছিলাম।

কিন্তু তার পর… রয়েল ইন্ডাস্ট্রির শেয়ার এক ধাক্কায় পড়ে যায়।

আমি মিঃ ডিউকের ব্যবসা নিয়ে সন্দেহ করেছিলাম, কিন্তু পরে জানতে পারি সেই দুটো ডিল ডিজাইন আর হেলথ গ্রোথ এর উপর ভিত্তি করে ছিল।

সব কিছু এলোমেলো লাগছে পাপা।

আমি বুঝতে পারছি না…

প্লিজ, হেল্প মি…!"

মিহিরিমা মাথা যেনো ঝিম ঝিম করছে ব্যথায়। বুকের মাঝে যেনো দলা পাকিয়ে আসছে তবুও  তার পাপার দেওয়া মৃত্যুর আগের জন্মদিনের গিফট টা হাতে নিয়ে মিহিরিমা অজান্তেই প্রচণ্ড খুশি হলো। বাক্স টা খুলে লকেট টা চোখে পড়তেই মিহিরিমা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। এই লোকেট তার পাপা এর দেওয়া শেষ স্মৃতি ছিল তবে অসাবধান বশতঃ তার কাছ থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। এত দিন পর সেটা ফিরে পেতেই, মিহিরিমা অপেক্ষা না করেই লকেট টা গলায় পরে ফেলে যেটা তার পাপা নিজে হাতে তার জন্য বানিয়েছিল।

" মিস ইউ পাপা। তোমার মৃত্যুর জন্য যেই দায়ী হোক না কেনো আমি নিজের হাতে তাকে  শাস্তি দেবো!!"

_________________________________

রুমে ফিরে আসতেই দরজার কাছে পুরুষালি হাসির শব্দে মিহিরিমার পা থেমে গেল। আড়াল থেকে তার নজর গেল ইউভান সোফায় বসে বেশ হেসে হেসে ফ্লোরা আন্টির সাথে কথা বলছে। তার চুল এলোমেলো, শার্ট এর বোতাম লাগানো নেই। ইউভান ঠিক কোথায় এত টা অগোছালো হয়ে গিয়েছিল মিহিরিমা দেখে নি। ফ্লোরা আন্টি রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই

ঠোঁট কামড়ে পা টিপে রুমে প্রবেশ করে—

"লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছো কেনো, মিসেস ডিউক?"

ইউভানের গলা ঠান্ডা, কিন্তু তাতে টিজিং ব্যাপার টা রয়েছে। যেনো সে এতক্ষণ মিহিরিমার অপেক্ষায় করছিল।

"তোমার হাসবেন্ড এতটা সেক্সি লাগছে বুঝি, যে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখার লোভ সামলাতে পারলে না?"

চোখ নামিয়ে আবার মিহিরিমার দিকে তাকায়,

"ডোন্ট ওয়ারি। আমি তো একেবারে তোমারই।"

মিহিরিমার মুখে লজ্জা, বিরক্তি আর দ্বিধা মিশে যায়।

তবুও বেশ বিরক্ত হয়ে বলে,

"ফ্লোরা আন্টি এলে ঠিক করে শার্টের বোতাম লাগাও..."

ইউভান হেসে উঠে বলে,

"তুমি ছিলে না বলে এই হাল হয়ে গিয়েছে আমার। বড্ড মিস করছিলাম। তুমি করো নি জানি । তাই তো চলে এলাম নিতে। কাল রাতে যেভাবে..."

তার চোখে যেনো একটু মিষ্টি দুষ্টুমি খেলে যায়,

"...যেভাবে বোতাম খোলার আগ্রহ দেখাচ্ছিলে, মনে হচ্ছিল লাগানোর চেয়ে খুলে দেওয়াই তোমার বেশি পছন্দ!"

মিহিরিমার মুখ লাল হয়ে ওঠে।

সে গম্ভীর হয়ে চোখ সরিয়ে নিতে চায়, কিন্তু ইউভান এবার উঠে এসে ধীরে ধীরে তার খুব কাছে দাঁড়ায়।

"তুমি ঠিক আছো তো?"

গলা একটানা শান্ত, কিন্তু চোখে সত্যিকারের উদ্বেগ ছিল ইউভান এর কন্ঠে।

মিহিরিমা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে থাকে।

এই মানুষটার প্রতি ঘৃণা তার মনে ছিল, আছে। কিন্তু সে কেন বারবার দুর্বল হয়ে পড়ছে? কেন তার দৃষ্টি এড়াতে পারছে না?

ইউভান তার কাঁধে হাত রাখে,

"শুধু মনে রেখো, তুমি একা নও। আমি আছি। সবসময় তোমার পাশে।"

এর মাঝেই ফ্লোরা আন্টি ইউভান এর জন্য স্ন্যাকস নিয়ে  প্রবেশ করে। ইউভান হাতে গুণে দুটো মুখে তোলে। মূলত বেশ তাড়াহুড়োয়  মিহিরিমা কে নিয়ে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে । মিহিরিমা কথা বাড়ায় নি আর তা

র মন আটকে রয়েছে সেই ফোন কলে। এখন উদ্দেশ্য ইউভান এর বাড়ির সেই স্টোর রুম।

________________________

এত কম কমেন্ট কেনো তোমাদের কি ভালো লাগছে না???

Write a comment ...

Write a comment ...