মিসেস আলেকজেন্দ্রি প্রত্যেক টা কথা এত তাই গভীর ছিল যে মিহিরিমা বুঝতে পারে নি তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে ।
মিসেস আলেকজেন্দ্রি নিজেও নিঃশব্দে কাঁদছিলেন। ইউভান কে তিনি নিজে হাতে বড়ো করেছেন। তার পর সামান্য ধাতস্ত হয়ে মিহিরিমার হাত ধরে বলে, মনের মাঝে কোনো দ্বিধা রাখবে না , বলে ফেলবে সম্পর্কে তৈরি হওয়া ভুল বোঝাবুঝি অনেক মারাত্মক।
মিহিরিমা মনে হলো তার গলায় দলা পাকিয়ে আসছে। তবুও তার উৎসুক মন জানতে চাইল, রেহান ডিউক কে কি সম্পত্তি তে ভাগ দেওয়া হয় নি?
মিসেস আলেকজেন্দ্রি হাসলেন, অবশ্যই তার তৈরি করা বিদেশি কোম্পানি গুলো ডিউক ফ্যামিলির ই ছিল। যার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়। কেবল তার ঠাকুর দা রয়েল ডিউক কোম্পানি কে ইউভান এর হাতে বর্তে দেন.. আ ...র
মিসেস আলেকজেন্দ্রি কথা শেষ করার আগেই প্রচণ্ড খাশি শুরু হয়ে যায়।
মিহিরিমা দ্রুত কিচেন থেকে জল এনে খেতে বলে ওনাকে, পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়।
" এখন কেমন লাগছে গ্র্যাণী !"
" উহু ওহহহ ঠিক আছি ডিয়ার, জাস্ট সর্দি টা বেশ ধরেছে। "
বাইরে থেকে তীব্র হর্নের শব্দ বেজে উঠল তখন ই।
মিসেস আলেকজেন্দ্রি মুখের হাসি টা প্রশস্ত করে মিহিরিমা কে বলে ওঠে, আমার গাড়ি চলে এসেছে।
রোজী ও তখন আগমন ঘটিয়ে বলে ওঠে, মিসেস আলেকজেন্দ্রি আপনার গাড়ি চলে এসেছে।
মিসেস আলেকজেন্দ্রি তাকে চোখের ইশারায় নিজের জিনিস পত্র গাড়িতে ওঠানোর নির্দেশ দিলেন। তারপর মিহিরিমা কে আগলে তার কপালে আলতো চুমু এঁকে দিতেই মিহিরিমা অজান্তেই হুহু করে কেঁদে উঠল গ্র্যাণী কে জড়িয়ে। তার পরিবার বাদে এই মানুষটা কে সবচাইতে আপন মনে হচ্ছে মিহিরিমার।
" গ্র্যাণী প্লিজ স্টে উইথ আস। এই পুরো বাড়িতে আমি একা হয়ে যাবো। আমার খুব কান্না পাচ্ছে প্লিজ... আমি আমার পরিবার কে খুব মিস করছি ... কত দিন তাদের দেখি না। "
মিসেস আলেকজেন্দ্রি মিহিরিমার বাচ্ছামো তে বিগলিত হলেন, বাচ্চা মেয়ে রোজী সব সময় তোমার সাথে আছে। তাছাড়া আমার ইউভি , ডেভিড সবার কাজকর্ম আমার নখ দর্পণে,। তারা একটুও যদি আমার এই মেয়ে কে কষ্ট দেয় সোজা এনকাউন্টার ! হাহা হা..
মিহিরিমা নিজেও ফিক করে হেসে ফেলে গ্যাণীর কথায়।
" গ্র্যাণী আমি এত বডিগার্ড এর প্রটেকশন চাই না। আমি চাই সাধারণ জীবন যাপন করতে। ইউভান হাই প্রোফাইল বিজনেস ম্যান , কিন্তু আমি তো নই। বাড়িতে এত প্রটেকশন, কোথায় গেলে এত বডিগার্ড এর কি প্রয়োজন আমার মাথায় ঢোকে না!!
যা শুনে মিসেস আলেকজেন্দ্রি হাসি টা মিইয়ে যায়। তিনি শান্ত অথচ রুক্ষ স্বরেই বলে ওঠে,
" Shhhhh! মিহিরিমা দেওয়াল এর কান আছে, এটা কখনোই সম্ভব না তুমি যে স্বাধীনতা চাইছো ওটা চেয়ে অন্যায় আবদার করো না। চাইলেও তুমি সাধরণ দের মতো জীবন যাপন করতে পারবে না। এটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিজের মনে গেঁথে নাও!!
মিসেস আলেকজেন্দ্রির প্রতিটা কথা হটাৎ মিহিরিমা র শরীরে কাটা দিয়ে ওঠে, কিছুক্ষণ আগেই আপন লাগা মানুষটা কে বড্ড অচেনা লাগতে শুরু করল তার। গ্র্যাণী কখনও তার সাথে এভাবে কথা বলে নি । কেনো এতো রহস্য সবার মাঝে। মিহিরিমা ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে থাকে এসব ভেবেই।
পুনরায় হর্নের শব্দে মিসেস আলেকজেন্দ্রি মিহিরিমা কে কিছু না বলে সামান্য হেসে রওনা দেন। মিহিরিমা পাশে রোজী ওনাকে ধরে গাড়িতে উঠিয়ে দিতে সাহায্য করলেন। গাড়িটা ভিলার রাস্তা ক্রশ করা অবধি এক ভাবে সেই পথেই তাকিয়ে ছিল।
" ম্যাম ! ম্যাম শুনছেন আপনাকে ডাকছি কখন থেকে .."
" হুহ উম আমাকে.. আমাকে ডাকছ রোজী?"
মিহিরিমা হটাৎ চটক ভাঙ্গে রোজির ডাকে।
" আপনাকে কখন থেকে ডাকছি কিন্তু কখন থেকে দেখছি বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন। উত্তর দিচ্ছেন না"
মিহিরিমা সামান্য অপ্রস্তুত হয়েই বললো, হুম কেনো উত্তর দেবো বলোতো। তুমি আমার বোনের বয়সী হবে তবুও বলা সত্ত্বেও ম্যাম আর আপনি বলা তুমি ছাড়ো না। এখন তো বাড়িতে আমরা দুজন বাকি গার্ড রা তো আমার অচেনা। প্লিজ রোজী আমায় দিদি বলে ডাকবে আর তুমি করে।
রোজী প্রথমে নাকচ করলেও মিহিরিমা জোড় জবরদস্তি তে রোজী তাকে দিদি বলতে স্বীকার করে।
^^^^^^
এই প্রথম মিহিরিমা রোজির সাথে কিচেনে প্রবেশ করতেই অবাক হলো।
" কি সুন্দর ইটোরিয়র ডিজাইনিং কিচেনের । এদিকটা তুমি সামলাও বলে আসায় হয় নি আর।"
রোজী ওভেনে রান্না টা বসিয়ে মিহিরিমা র কথায় মুচকি হাসল। মিহিরিমা তখন ঘুরে ঘুরে পুরো রান্না ঘর টা দেখতে ব্যস্ত।
" আমার মা বহু বছর ডিউক ফ্যমিলি তে কাজ করেছে, আমিও ছোট থেকে এখানেই মানুষ, মা এর মৃত্যুর পর মিসেস আলেকজেন্দ্রি আমায় স্যার দায়িত্বে এই ভিলায় পাঠান।"
মিহিরিমা অবাক হয়ে শুনল সবটা।
" আচ্ছা তোমার মা এখানে কাজ করতো। এরপর তুমি কিন্তু চাইলেই পড়াশোনা করে কিছু করতে পারতে!"
মিহিরিমার কথায় রোজী ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে জবাব দেয়, আমরা গরীব মানুষ। আমাদের পরিবার বহু বছর আগে থেকে ডিউক ফ্যমিলি কে সার্ভ করে আসছে। আর আমকে পড়াশোনার সমস্ত সুযোগ দেওয়া হলেও আমি তাতে নিম্ন মানের ছিলাম তাই বড়ো কিছুর কথা ভাবি নি। ডিউক ফ্যামিলির রয়েলিটি ইংল্যান্ডে অনেক শতক ধরে বয়ে চলেছে। আমার পরিবার ও তাদের সেবা করে আসছে শতক ধরে।
মিহিরিমা ধীর গতিতে এগিয়ে যায় রোজির পাশে।
" একদম মন খারাপ করবে না আমার মা ছাড়া কেউ নেই পৃথিবীতে, । তুমি আমার বোনের মতো। আমাকে দিদি মানলে কি তোমার অসুবিধে হবে?"
রোজী হটাৎ ই অবাক করে দিয়ে জড়িয়ে ধরে মিহিরিমা কে। রোজির চোখে জল। তার মতো কেয়ার টেকার কে মিহিরিমা এত সহজে বোন বানিয়ে ফেললো। যা অবিশ্বাস্য।
" এই কান্না কাটি বন্ধ, আগে বলো কি রান্না করছো। "
" এটা স্যার এর পছন্দের এক ইটালিয়ান ডিস Spaghetti alla Carbonara. "
মিহিরিমা নাক কুঁচকে ফেললো খাবার টি দেখে । সে বরাবর ব্রিটিশ চাইনিজ আর ইন্ডিয়ান খাবার পছন্দ করে কিন্তু যাকে বিয়ে করেছে সে তো ঘাস পাতা ছাড়া কিছুই খায় না।
" আজ তোমার স্যার কখন বেরিয়েছে? "
" দি সকাল ৮ টা নাগাদ, বেশ তাড়াহুড়োয় বেরোলো, তুমি জানতে না?"
" না আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি সে নেই, গ্র্যাণি যাবে আজ দেখা করে অন্তত যেতে পারতো! অফিসের কাজ মানছি, একটা দিন ছুটি নিলে কি হয় "
" তুমি কবে থেকে অফিস যাবে?"
" আজ হঠাৎ গ্র্যাণী না গেলে আজকেই যেতাম , কিন্তু এভাবে গ্র্যাণী বিদায় না জানিয়ে ছেড়ে না আসতে পারলে কেমন দেখাতো!"
" স্যার বরাবর ই কাজ পাগল। "
দুজনেই কথা বলতে বলতে রোজির প্রায় রান্না শেষ। মিহিরিমা অফিসের কিছু কাজ ঘরে বসেই করছিল, রোজী তাকে অনেকবার লাঞ্চ এর কথা জিজ্ঞেস করলে নাকচ করে দেয়।
মিহিরিমা কেনো জানি বড্ড অস্থির লাগতে শুরু করে, সেই সকালে মানুষটা বেরিয়েছে কোনো খোঁজ নেই, অন্যদিন গ্র্যাণী থাকলে বাড়িতে বেশ দু তিনবার আসতো। মিটিং শেষে বাড়িতে এসেই রেস্ট নেয় ইউভান। তবে আজ কিসের এত জরুরি তলব। অস্থির পায়ে নিজের রুম টাতে হাঁটতে থাকে সে।
হটাৎ থেমে নিজের মনেই বলে ওঠে, রিমা তুই আসলেই বোকা, নেই লোকটার কথা ভাবছিস যেই লোকটার অতীতে তোর চোখ দিয়ে জল পড়ছে। সেই লোকটাই তোর বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী।
ঘড়িতে ঢং করে বেল বাজতেই নজর এলো অনেক আগে সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত ১১ টা বাজছে। মিহিরিমা গলার কাছে দলা পাকিয়ে এলো। অনেক রাত হয়েছে। ইউভান এখনো কেনো আসল না।
দ্রুত পায়ে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে বেশ জোরেই চেঁচিয়ে রোজী কে ডাকল সে। বেশ কয়েকবার। কারোর সাড়াশব্দ নেই। মনে হচ্ছে সমস্ত ভিলার একাকীত্ব তাকে গিলতে আসছে।
তখন ই এক গার্ড এসে খবর দিল, ম্যাম , রোজী ৮ টায় তার কোয়ার্টার এ ডিনার করে চলে গিয়েছে।
যার মাথা নিচু, মুখ ও শরীর বুলেট প্রুফ বর্মের পোশাকে ঢাকা।
মিহিরিমা কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই তার মনে হলো কারোর এক দৃষ্টি অচেনা, অজানা, । দম আটকে এলো তার,। এক জোড়া চোখ যেনো তাকেই দেখছে। কে সে? তৎক্ষণাৎ কাচের জানালার ফাঁকে তাকাতেই ...
ফাঁকা! কেউ তো নেই, । কিন্তু মিহিরিমা তো দেখেছে কেউ ছিল। কাপা পায়ে
মিহিরিমা এগিয়ে এসে জানালার কাছ ঘেঁষে দাঁড়াতেই দেখল বাইরেই ঝোপের গাছ টা নড়ছে। জানালার কাঁচ খুলে ঝটপট বাইরে তাকিয়ে দেখল না কেউ তো নেই। মিহিরিমা স্বস্তি পেল। হয়তো ভ্রম। আসলেই কি?
" ম্যাম জলদি আসুন, স্যার এর গুলি লেগেছে"
মিহিরিমা হটাৎ মনে হলো তার শরীর দুলে উঠলো। ইউভান এর গুলি লেগেছে!
Write a comment ...