13

টিউলিপ গার্ডেন 🌷

মিহিরিমার অফিসে আজ সময়ের আগেই চলে এসেছে। কাল এত রাতে মিঃ ডিউক এর ধমকি টা এখনো তার কানে বাজছে! ইউভান এর রাগ সম্পর্কে তার এতদিনে ধারণা হয়ে গিয়েছে। আগ বাড়িয়ে কোনো ঝামেলা চায় না আর।  মিহিরিমা অফিসে ঢুকতেই সকল কে হাই বলে অভ্যর্থনা জানাল।

অনেকেই আছে যারা মিহিরিমার এই অফিসে প্রবেশে সন্তুষ্ট না। তবে এতে তার কিছু যায় আসে না। অফিসে সবচাইতে বেশি খোলামেলা হয়েছে রিসেপশন এ থাকা জেসমিন এর সাথে। মিহিরিমা  নিজের সরল হাসি মুখে নিয়েই জেসমিন এর সাথে আলাপ করল। জেসমিন বেশ চিন্তিত গলায় বলল, মিহিরিমা  স্যার অনেক ক্ষণ আগে এসে গিয়েছে.. ফাইল গুলো ও পাচ্ছি না । আমার হাত পা কাপছে।

বোঝাই যায় ইউভান এর নিত্য অফিস যাতায়াতে কেউ ই অভ্যস্ত না। কাজ ফাঁকি হলে রাগের প্রকোপ ঘাড়ে পড়বে এই জন্যই অফিসে সমস্ত কর্মচারী খাওয়া বসার ও সময় পায় না। মিহিরিমা  মিনমিন করে বলল, আমি তো টাইম মতোই এসেছি... মিঃ ডিউক আগে আসবে আমি কি করে জানবো! আমার তো ভয় লাগছে জেসমিন।

জেসমিন শুকনো মুখে বলল, আর দেরি করো না । কেবিনে যাও স্যার এর। তোমার খোঁজ করেছিলেন একবার!

মিহিরিমা র দুরু দুরু অবস্থা। হাতে ফাইল টা নিয়ে কেবিনের সামনে মৃদু গলায় পারমিশন চায়।

__" may I come in sir?"

ওপর পাশে নিস্তব্দতায় কম্পিত পায়ে থাই গ্লাস সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে মিহিরিমা । দেখল মিঃ ডিউক এক ভাবে মুখ গুঁজে রেখেছে ল্যাপটপে।

মিহিরিমা আলতো পায়ে টেবিলের ওপর ফাইল টা রেখে  পেছন ঘুরে বেড়িয়ে যেতেই নিয়েছিল..।

_" দাঁড়াও!"

পুরুষালী একটা গম্ভীর আওয়াজ। ভয়ে মিহিরিমার হাত ঘেমে এসেছে। পেছন ঘুরে পুরোপুরি ইউভান এর চোখ আর তার চোখ দু সেকেন্ড এর ব্যবধানে মিলিত হলো ঠিকই... ইউভান মুখের গম্ভীরতা বজায় রেখে বলল, আজ তুমি আমার সাথে সাইট ভিজিট করতে যাবে।

জাস্ট একটা বাক্য বলেই ইউভান আবার ও ল্যাপটপে মুখ গুজে রাখে।

মিহিরিমা নিজের বক্তব্য রাখার ও সময় পেল না। রাগে দাঁতে দাঁত চাপল সে। কেবিন থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল বড়ো বড়ো পা ফেলে।

ইউভান ল্যাপটপ থেকে  মুখ সরিয়ে দেওয়ালে লাগানো  সিসিটিভি স্ক্রীন তাকিয়ে তির্যক হাসল।  মেয়েটা এখন ক্যান্টিনে গিয়েছে কেবিন থেকে বেরিয়ে সবটাই ইউভান স্ক্রীন এ দেখছে।

মিহিরিমা ম্যাসেজ পেয়েছে   তাকে পার্কিং লট এর সামনে দাড়াতে হবে। আজ প্রাক্টিক্যালি অফিসে কোনো কাজ নেই। মিঃ ডিউক এর কফি টা রাম চাচার দিয়ে পাঠিয়েছে তাই মিহিরিমা ক্যান্টিন থেকে সরাসরি গ্রাউন্ড ফ্লোরে চলে আসে। সেখানে পেড্রোর সাথে মুখোমুখি হতেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে

মিহিরিমা।

__" হেই মিহিরিমা! What are you doing here?"

মিহিরিমা মিষ্টি করে হাসল। কিছু বলতে যাবে তার আগেই পেছন থেকে সেই গম্ভীর পুরুষালী আওয়াজ টা তার কানে আসল।

__" পেড্রো! আমি নিউ সাইট ভিজিট এর জন্য যাচ্ছি ( মিহিরিমার দিকে তাকিয়ে) মিস বর্মন ও আমার সাথেই যাচ্ছে!"

__" গ্রেট! আমিও তোমাদের সাথে যাচ্ছি তবে"... পেড্রো কথা টি বলেই গাড়িতে উঠে বসল সরাসরি।

মিহিরিমা খেয়াল করল ইউভান এর মুখাবয়ব প্রচণ্ড পরিমাণে গম্ভীর হয়ে আছে।  পেড্রোর উপস্থিতি টা কি মিঃ ডিউক পছন্দ করছেন না!

___" হেই মিহিরিমা প্লিজ টেক ইউর সিট"

পেড্রোর ডাকে মিহিরিমা নিজের ভাবনার থেকে বেরিয়ে দেখল মিঃ ডিউক ততক্ষনে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ফেলেছেন। অদ্ভুত! দ্রুত পায়ে গাড়িতে উঠে বসে মিহিরিমা।

গাড়ি চালু হতেই পেড্রো সামনের সিটে বসেই মিহিরিমার উদ্দেশ্যে বলল, তো এক্স বয়ফ্রেন্ড এর আঙ্কেল এর আন্ডারে কাজ এর এক্সপেরিয়েন্স কেমন তোমার মিহিরিমা?

মিহিরিমা আকাশ সমান অস্বস্তি নিয়ে সামনের দিকে তাকালে ন্যানো সেকেন্ড এর জন্য ইউভান এর সাথে চোখাচোখি হয়। যা তার শরীরে মৃদু ঝাঁকির সৃষ্টি করে। প্রথম দিন কিভাবে সে মিঃ ডিউক এর ওপর ঝাপিয়ে পড়েছিল ... এরপর ঘনিষ্ঠতা সবটাই একটা অ্যাকসিডেন্ট হিসেবে মেনে নিয়েছে মিহিরিমা। এরপর ও মিঃ ডিউক এর উপস্থিতি তাকে বিচলিত করে।

মিহিরিমা কে চুপ করে থাকতে দেখে পেড্রো আবার ও বলল, আচ্ছা বাদ দাও। কিছুদিনের মধ্যে ধারণা ঠিক ই হয়ে যাবে তাই না ব্রো!

ইউভান কোনো রকম রেসপন্স না করেই ড্রাইভিং করছিল । পেড্রোর অবান্তর কথায় ইউভান এর কোনো ধ্যান নেই। মিহিরিমা মুখ বেকাল। কেমন মানুষ নিজের বন্ধুর সাথেও হেসে কথা বলে না। ছোটো বেলায় কি সে তিতা করলা খেয়েছিল! সারাক্ষণ চুপচাপ , গম্ভীর আর খিটখিটে। নেহাত টাকার প্রয়োজনে কাজ করছে সে!

এরপরের রাস্তা পেড্রো আর মিহিরিমা বেশ জমিয়ে কথা বলল। সে কি কি করতে ভালোবাসে..  মিহিরিমা পেড্রোর সাথে কথা বলতে বেশ উৎফুল্লতা নিয়ে নিজের পুরোনো রূপে ফিরে গিয়েছে।

ইউভান rearview mirror দিয়েই মিহিরিমার উৎফুল্ল ভাবে কথা বলার ধরন ... নতুন একটি রূপে আবিষ্কার করল যেনো। তার আইবল মিহিরিমার প্রতিনিয়ত নড়তে থাকা গোলাপী ঠোঁট পেরিয়ে কলারবন নেক বোন এর মাঝে গিয়ে আটকাল। যেখানে থাকা লালচে তিল টা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে প্রতিনিয়ত। ভি কাটের টপ টায় মিহিরিমা তাকে সিডিউস করছে নিজের অজান্তে! ইউভান নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে শার্ট এর একটা বটন খুলে ফেলে।

মিহিরিমা ঝনে ঝণে হাসি তে ধ্যান ভাঙ্গে ইউভান এর । হটাৎ ই তার পেড্রোর সাথে হেসে হেসে কথা বলায় কালকের রাগ টা চারা দিয়ে উঠল। সারা টা রাস্তা কুলুপ এঁটে রইল সে।

আধ ঘণ্টার মধ্যে গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছাল। মিহিরিমা গাড়ি থেকে বের হয়ে সবুজ পরিবেশে লম্বা শ্বাস নিল। আহ! প্রকৃতির আবহাওয়া কত সুন্দর।

সেখানেই একটা খালি জমি দেখতে এসেছে তারা। ইউভন পেড্রো এগিয়ে গিয়ে উকিল এর সাথে দেখা করল প্রথমে ।

চারপাশ টা টিউলিপ গাছের চাষ করা। মিহিরিমা  চারপাশ টা দেখে এত টাই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল একলাই হেঁটে এগিয়ে যেতে লাগল।

ইউভান জায়গা টার মাপ নিয়ে তখন কারোর সাথে কথা বলছে। পেড্রো হটাৎ দেখল চারপাশে মিহিরিমা নেই । কোথায় গেল মেয়েটা? পেড্রো ইউভান কে ডিস্টার্ব না করে সোজা পথ হাঁটা ধরল।

__" ওহ এই সুন্দরী মেয়েটা কোথায় হারিয়ে গেল!"..নিজের মনে  বলে পেড্রো নিজের মাথা চুলকে হাসল লজ্জায়।  সে আশা করে আছে একসময় সে আর মিহিরিমা  রিলেশন থাকবে।  সঠিক সময় আসলে সরাসরি জানাবে ভালোলাগার কথা!

°

 

মিহিরিমা  অনেক বার শুনেছে টিউলিপ গার্ডেনের ব্যাপারে কিন্তু স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য যেনো আজ হয়েছে তার। এ যেনো স্বপ্ন তার কাছে । লাল হলুদ , সাদা কত রকমের টিউলিপ  সারি সারি সজ্জিত। মিহিরিমার মনে পড়ে ছোটো বেলায় তার পাপা একবার বলেছিল .. টিউলিপ হলো ভালোবাসা এর সৌন্দর্যের প্রতীক। মিহিরিমার মন ও এই সৌন্দর্যে বিগলিত মুগ্ধ হয়েছে। ফুল গুলো ছুঁয়ে দেখছে.. পাপড়ির তুলতুলে ভাব টা হাতে স্পর্শ করার চেষ্টা করছে। 

স্কার্ট পরে গোল গোল ঘুরছে মিহিরিমা। যেনো এই ফুল গুলোর রানী সে। তার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে যে সে অফিসিয়াল কাজে কার সাথে এসেছে। ছোটো শিশুর ন্যায় উত্তেজিত আনন্দিত!

__" মিহিরিমা কাম হেয়ার ফাস্ট!"

ফাঁকা মাঠে কথা টি ইকো হলো দুবার। মিহিরিমা হটাৎ থেমে গিয়ে দেখল দুর থেকে পেড্রো হাত নাড়ছে। ওহ গড! সে তো অফিসিয়াল কাজে এসেছিল  মিঃ ডিউক এর সাথে! হাঁটতে হাঁটতে কখন এই গার্ডেন এ চলে এসেছে ... ভয়ে ঘন ঘন  ঢোক গিলল মিহিরিমা। মিঃ ডিউক এর মুখোমুখি কিভাবে হবে সে?

হেঁটে গেলে অনেকটাই সময় লাগবে তাই দ্রুত যাওয়ার জন্য দৌড়াতে লাগল মিহিরিমা। সূর্যাস্ত হওয়ার পথে। তার সারা শরীর কাপছে।  হঠাৎ ই পা হড়কে নিচে পড়ে যায় মেয়েটা। হাতের কুনোই ক্ষত টা গভীর লাগে। হাঁটু তেও

কেটে গিয়েছে। উঠতে কষ্ট হলো মিহিরিমার। কান্না পেল। হাত পা জ্বলে যাচ্ছে যে!

Write a comment ...

Write a comment ...