ঘুম ভাঙতেই শরীরে পাতলা সাদা কাপড়ের আবরণ দেখে এক মুহুর্ত থমকে যায় মিহিরিমা। চুল গুলো খিঁচে ধরে কালকের কথা গুলো মনে করার চেষ্টা করে। থম থমে মুখে বসে থাকে মিহিরিমা । বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলে, fuck! কাল রাতে কি না ফারহান এর আংকেল এর সাথে ...!!
গুনে গুনে আধ ঘণ্টা লাগিয়ে মিহিরিমা ফ্রেশ হতে নিল। সারা শরীর জুড়ে যন্ত্রণা ! বাইরে এসে রুম টা তে কাউকে দেখল না সে। বেশ আলিশান ভাবে সাজানো একটা রুম । মিঃ ডিউক নিশ্চই অনেক আগেই চলে গিয়েছেন! মিহিরিমা টেবিলে খাবার ট্রে তে একটা চিঠি দেখতে পায়। নিশ্চয় মিঃ ডিউক এর সেটা...।
মিহিরিমা মনে মনে ভাবছিল কাল রাতের ব্লান্ডার টা বড়ো একটি মিসটেক । এই ব্যাপারে কথা বাড়াতে চায় না আর। তার বয়ফ্রেন্ড এর ব্যাচেলর আঙ্কেল এর সাথে ... বিষয় টা বেশ embarassing!!
চিঠি খুলেই বড়ো আমাউন্ট এর একটা চেক দেখে অবাক না হয়ে পারল না মিহিরিমা ... সন্দিহান চোখে লেখা টা পড়তে শুরু করল....।
You will definitely need this money in your situation ,, ___ মিহিরিমা শুকনো মুখ নিয়ে চেক টার দিকে তাকিয়ে ভাবল .... আসলেই তো তার টাকার খুব দরকার । কিন্তু মিঃ ডিউক কি তাকে কাল রাতের বিনিময়ে এই টাকা গুলো অফার করেছেন !! This was just a one night stand and nothing more.. চেক টাকে ছিঁড়ে ফেলে হিলের শব্দ তুলে বেরিয়ে আসে রুম টি থেকে।
:
:
লন্ডনে আর পাঁচটা ছোটো পরিবারের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা মিহিরিমা বর্মার । নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি । বাবা এক বিদেশি ওষুধের কোম্পানি তে জব করত। মা ছিলেন হাউজ ওয়াইফ। ছোটো পরিবারে খুশির ঘাটতি ছিল না তাদের। মিহিরিমা ডাক্তার হওয়ার শখ নিয়ে
"Imperial College of London" চান্স পায়। সেখানেই পরিচয় হয় ফারহান এর সাথে , তাদের মধ্যে মন দেওয়া নেওয়া হতে থাকে, সম্পর্কের গভীরতা বাড়ে। এত দূর সব কিছু স্বপ্নের মতো বাস্তব টা ভেঙে চুরমার হয়ে যায় নিমিষে। ততদিনে
বিশাল পরিমাণ ঋণ শোধ করতে না পারায় মিহিরিমার পরিবার দিন দুপুরে দেউলিয়া হয়ে পথের ভিখারী তে পরিণত হয়। মিহিরিমার বাবা সেই শোকে হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে গমন করেন । একের পর এক ধাক্কায় বিদ্ধস্ত হয়ে মিহিরিমা মা কে নিয়ে ভাড়া বাড়িতে মাথা গোঁজার স্থান জোগাড় করলেও , অর্থের অভাব চারপাশ থেকে যেনো তার পরিস্থিতি আরো শোচনীয় করে তোলে। বাবার মৃত্যু টা তার কাছে আকাশ ভেঙে পড়ার মতো মনে হয়েছিল। এই পরিস্থিতি তে ফারহান ই তাকে সামলিয়েছে। বাবার মৃত্যুতে মিহিরিমার পাশে ফারহান এর কাঁধ না থাকলে সে হয়তো স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেত না। ফারহান তাকে চিট করছে এটা কল্পনাতীত ছিল মিহিরীমার কাছে। তার সব চাইতে ভরসার স্থান বাবার পরে ফারহান কেই দিয়ে এসেছে। এত বছরের সম্পর্ক তে কিভাবে ঠকাতে পারল ও মিহীরীমা কে?
:
:
আর্চার ডিউক সবচাইতে বিত্তশালী ব্যক্তি ছিলেন ইংল্যান্ডের । দ্য ডিউক এন্টারপ্রাইজ এর মালিক। কিন্তু তার মৃত্যুর পর ,
ইউভান will be next in line.
পঁয়ত্রিশ বয়সী ব্যাচেলর ইউভান এর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব , সৌন্দর্য , নারীদের কে মাতোয়ারা করে দেয়। ইউভান ডিউক কে চেনে না এমন খুব কম আছে ইংল্যান্ডে। মিহিরিমা ফারহান এর ফ্যামিলি পার্টি তে ইউভান এর সাথে প্রথম আলাপ করেছিল। ফারহান এর আঙ্কেল বেশ ওয়েলদী পারসন এটা ফারহান এর কাছ থেকেই শোনা। কাল রাতের ঘটনা টা একটা মিসটেক ছাড়া কিছুই না। কারণ এতে মিহীরিমার ও কিছু দোষ ছিল।
:
:
হোটেল থেকে সরাসরি বাড়ি এসে মিহিরিমা জানতে পারে বিগত কয়েক মাসের রেন্ট চাইতে বাড়ির মালকিন আবার ও এসেছিল টাকার জন্য। মিঃ ডিউক এর চেক টা ফেরত দেওয়ার জন্য মিহিরিমা আপসোস করল। ফারহান এর সাথে দেখা করতে হবেই তার। জবাব দিহি চাইবে এত বছরের সম্পর্কের!! একটা কাজ খুঁজছে মিহীরিমা পার্ট টাইম। অনেক টাকার ঋণ এখনো মাথায় আছে। তার মায়ের শরীর ও ভালো না। উনি হাই প্রেশার এর রুগী। এমবিবিএস এ ইন্টার্শিপ করছে সে। যখন তখন ডিউটি থাকে। টাকা কুলিয়ে উঠতে পারে না। মিহিরিমার মা হেলেনা বেশ কিছু দিন ধরে অসুস্থ। বাবা চলে যাওয়ার পর তার মা বেশ ভেঙে পড়েছেন মানসিক ভাবে । মিহীরিমার বাবা ইন্ডিয়ান বেঙ্গলি ছিলেন .... মা ছিলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান ...বাড়ির অমতে প্রেম করে বিয়ে করে লন্ডনেই স্যাটেল হয়ে যান। ভালোবাসা ছিল অফুরন্ত দুজনের মাঝে। মিহিরিমা নাম টা তার বাবা ভালোবেসে রেখেছিল ।
একটা ঝড়ে সব কিছু কিভাবে তছনচ হয়ে গেল। মিহীরিমা মা কে ওষুধ গুলো বুঝিয়ে পার্স নিয়ে বেরিয়ে পড়ল আবার ফারহান এর বাড়ির উদ্দেশ্যে। আজ রাতে ডিউটি আছে তার হসপিটালে।
ক্যাব আর্থার লেন বলে এরিয়ায় নামিয়ে দিল মীহিরিমা কে। ফারহান এর বাড়িতে এর আগেও বহুবার এসেছে কিন্তু আজ মন টা বারবার বিষাদে ভরে উঠছে তার।
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
ফারহান এর কাছ ঘেঁষে বসে আছে একটি মেয়ে। মাঝ বয়সী মহিলা যে ফারহান এর মা ইসাবেলা সাথে মিঃ ডিউক বাগানের লনে একই টেবিল বসে ব্রেকফাস্ট করছে তারা । মিহীরীমার কাছে আসতে আসতে সব পরিষ্কার হচ্ছে বিষয় টি। এই মেয়ে টিকেই কাল ফারহান এর সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখেছিল ..।
" ফার __ হান!"
কাঁপা গলায় চিল্লিয়ে ওঠে মিহিরিমা। তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে ।
ফারহান মিহিরিমা কে এই সময় এভাবে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। টেবিল ছেড়ে এগিয়ে আসে মিহিরিমার কাছে।
" মিহি তুমি এখানে কিছু হয়েছে কি? আন্টি ভালো আছে তো। "
মিঃ ডিউক কেমন অপরিচিতের মতো মিহিরিমার দিকে তাকাল দেখে..মিহিরিমা স্বস্তির শ্বাস ফেলল । ফারহান এর মা এগিয়ে এসে বেশ রুক্ষ ভাবে বলল, ফারহান আর মিয়ামির এগেজমেনট ফাইনাল মিহি । তুমি প্লিজ ফারহান কে জ্বালিয়ও না আর । আমি চাই না তোমাদের সম্পর্ক টা এগোনো ভালো হবে।
মিহিরিমা একবার ফারহান আর রোজির হাত একে ওপরের মাঝে আবদ্ধ দেখে তাচ্ছিল্য হাসল।
" ফারহান মা এর শরীর ঠিক নেই । ল্যান্ড লেডি টা বকেয়া টাকা চাইছে বারবার সব দিক সামলাতে পারছিলাম না একা । তুমি হটাৎ হাত ছেড়ে দিলে কোন অপরাধে তাই ভেবেছিলাম উত্তর চাইতে আসবো । কিন্তু আমার সব বোঝা হয়ে গিয়েছে। "
ফারহান বেশ অস্থির হয়ে বলল, বিশ্বাস করো মিহি তুমি যা ভাবছো তেমন টা নয়। ল্যান্ড লেডির টাকা আমি দিয়ে দেবো বেবি। তুমি এত ভেবো না। আর এসব কিছু যা দেখছো তাও সত্যি না।
মিঃ ডিউক নিরবেই সব কিছু দেখছিলেন । মিহিরিমা ওনার দিকে এক পলক তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বলল, আমি টাকার জন্য আসি নি ফারহান। এত বছরের সম্পর্ক তে কি এমন খামতি ছিল আমার মধ্যে যে এভাবে ঠকতে হলো। জবাব দিহি করতে এসেছিলাম। আন্টি সবটাই পরিষ্কার করে দিল। আমার এখন আসা উচিত।
মিহিরিমা তার কথা গুলো কিছুটা মিঃ ডিউক কে উদ্দেশ্য করে বলেছে। মিঃ ডিউক তাকে গোল্ড ডিগার ভেবেছে বলেই এত অ্যামাউন্ট এর চেক অফার করেছিল..।
" মিহি স্টপ ! আমার কথা শোন প্লিজ। সবটা শুনলে তোমার ভুল ধারণা ভাঙবে। ",, ফারহান পেছন থেকে বেশ কয়েক বার মিহিরিমা কে আটকানোর চেষ্টা করল। ইসাবেলা বিরক্ত হলো নিজের ছেলের প্রতি। মিহিরিমা কে তার কখনোই পছন্দ ছিল না। মিডিল ক্লাস স্ট্যাটাসের মেয়ে। তাও আবার দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে। এরা কখনোই ডিউক ফ্যামিলির রিয়েলিটি তে বিলং করে না। তিনি রোজি কে ইশারা করলেন ফারহান কে সামলাতে।
_________________________
মিহিরিমা মাঝ পথ দিয়ে একা হেঁটে যাচ্ছিল। চোখ দিয়ে ক্রমাগত জল গড়িয়ে পড়ছে। ইসেবেলা তাকে প্রথম থেকেই পছন্দ করতেন না। ফারহান এর মুখ দেখেই রাজি হয়েছিলেন ঠিক ই। কিন্তু দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ঘটনা টায় পুরো পুরি বেঁকে বসেছেন তিনি। ভাগ্য তাকে কোন পথে নিয়ে এসেছে ... ঠিক তখন ই ঝড়ের গতিতে কালো মার্সিডিজ টা তার পথ আটকে দাঁড়ায়।
" আঙ্কেল ইউ_ভান",, হ্যা মিহিরিমা প্রথম দিন এই নামেই সম্মোধন করেছিল ব্যক্তি টিকে। কারণ সে ফারহান এর আঙ্কেল হয় সম্পর্কে।
" Get in the car first",, মিঃ ডিউক এর কথা টি অর্ডার এর মতো শোনাল। মিহিরিমা উঠে বসে.. গাড়িতে কারণ সে খুব ই টায়ার্ড ফিল করছিল।
পুরোটা রাস্তা নিস্তবতায় কাটে দুজনের মাঝে। মিহিরিমা চোখ বন্ধ করে রেখেছিল । সে ভেতর থেকে প্রচণ্ড ভাবে ভেঙে পড়েছে। কিন্তু যত টা সম্ভব নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে।
" তোমার লোকেশন এ পৌঁছে গিয়েছি"
মিহিরিমা চোখ খুলে দেখল আসলেই এটা তার বাড়ির রাস্তা। ছোটো করে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়ি থেকে নামতে যাবে ঠিক তখন ই ইউভান পেছন থেকে ডেকে ওঠে... Mihirima take this card.. You can do part time job here..
মিহিরিমা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, What are you favoring me for?
" চেক টা ছিঁড়ে ফেলেছো জেদ দেখিয়ে..now you want to return the last offer are you sure?"
মিহিরিমা খপ করে ছিনিয়ে নিল কার্ড টা। বার এ ওয়েট্রেস এর কাজ! কিন্তু
এটা ছাড়া তো আর কোনো উপায় নেই। তাই রাজি হয়ে গেল মিঃ ডিউক এর অফারে।
Write a comment ...